জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'শিকল-পরার গান' কবিতার পঙ্‌ক্তি দিয়ে নিবন্ধের সূচনাপাঠ। 'এই শিকল-পরা ছল মোদের শিকল-পরা ছল।/এই শিকল প'রেই শিকল তোদের র্ক‌ব রে বিকল/ ...তোমার বন্ধ ঘরের বন্ধনীতে র্ক‌ছ বিশ্ব গ্রাস/আর ত্রাস দেখিয়েই করবে ভাবছো বিধির শক্তি হ্রাস!/সেই ভয়-দেখানো ভূতের মোরা করব সর্বনাশ,/এবার আন্‌বো মাভৈঃ-বিজয়-মন্ত্র বল-হীনের বল/তোমরা ভয় দেখিয়ে র্ক‌ছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়;/সেই ভয়ের টুঁটি র্ধ‌ব টিপে, র্ক‌ব তারে লয়!/মোরা আপনি ম'রে মরার দেশে আন্‌ব বরাভয়,/মোরা ফাঁসি প'রে আনব হাসি মৃত্যু-জয়ের ফল' দ্রোহের আবেগ ও বিবেকপ্রাণিত পরন্তপ মানবসমৃদ্ধ চট্টগ্রামের সুপ্রাচীন ইতিহাস শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বসভ্যতার অচ্ছেদ্য অধ্যায়ে অত্যুজ্জ্বল সুপ্রতিষ্ঠিত। 'আর্যীকরণ' অভিধায় পরম্পরা বৈশিষ্ট্যে হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রসারমান প্রকর্ষ চট্টগ্রামকে দিয়েছে যশস্বী অবস্থান। একুশের পটভূমি রচনায় চট্টগ্রামের অবদান কতটুকু প্রণিধানযোগ্য তার নৈর্ব্যক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্নেষণ বারংবার প্রয়োজন।
কাজী নজরুলের উল্লিখিত পঙ্‌ক্তিগুলো ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রাম বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মনীষায় অমর ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামবাসীর সন্দীপন ভূমিকার শৈলী উচ্চারণ। মনস্বী অনুমেয় ১৩৪৬ সালে সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহর শাসনকালে বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ তথ্যে চট্টগ্রামের আদি রূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রায় একই সময়ে চৈনিক লেখক ওয়াংতা-ইউয়ান রচিত 'তাও-য়ি-চি-লিয়েহ' গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত বিবরণী চট্টগ্রামের স্বীকৃত উপস্থাপন। অনবদ্য বিবরণ রয়েছে ১৪১৫ সালে বাংলার শাসক জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহর সাক্ষাৎপ্রার্থী চীন সম্রাটের দূত ফেই-শিন-এর লেখা 'শিং-ছা-শ্যাং-লান' গ্রন্থসহ বিপুল সংখ্যক পর্যটন লেখনীতে। অধিকতর গুরুত্ব বহন করেছে চট্টগ্রামে আরাকানি শাসন। একদিকে মুসলিম জনবসতি এবং অঞ্চল শাসনে মুসলিম প্রভাব, অন্যদিকে সল্ফ্ভ্রান্ত আরাকানিদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যুগান্তকারী উত্তরণ ছিল চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নিরন্তর রশ্মি।
হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় চট্টগ্রামে সংঘটিত নানাবিধ সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের সমীকরণ সমার্থক বিদ্রোহ-বিপ্লবের যুগসন্ধির সঞ্চার সর্বত্র সমাদৃত। ব্রিটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন সিপাহি বিদ্রোহের প্রধূমিত প্রণোদনায় চট্টগ্রামে সিপাহিদের বিদ্রোহ, কারাভাঙা, বন্দিমুক্তি এবং সরকারি কোষাগার দখল বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এ জন্যই সিপাহিদের ফাঁসি, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রত্যয়িত দৃষ্টান্ত। ১৮৯২ ও ১৮৯৬ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক চট্টগ্রামকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসাম প্রদেশের সঙ্গে সংযুক্তির প্রতিবাদে চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ১৯০১ সালে 'চট্টগ্রাম বিভাগীয় সম্মিলন', ১৯০২ সালে বিপ্লবী যাত্রামোহন সেনের সভাপতিত্বে ২৯ ও ৩০ মার্চ প্রথম বার্ষিক সভা, ১৯০৩ সালের ১৩ ও ১৪ মার্চ কুমিল্লা টাউন হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সম্মিলন অনুষ্ঠান, চট্টগ্রাম-নেতৃত্বের অভূতপূর্ব প্রথীয়ান অহিংস প্রেরণার প্রভাব উন্মোচন করে। দেশপ্রেমের অভিযাত্রায় শ্রদ্ধাভাজন যাত্রামোহন সেন, এইচ.এম. পার্সিভ্যাল, শশাঙ্কমোহন সেন, মৌলভি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী, কাজেম আলী মাস্টার প্রমুখের ভূমিকা ছিল অসাধারণ।
১৯০৫ সালে রাউজানের কোয়েপাড়ায় শ্রদ্ধেয় যামিনী সেন প্রতিষ্ঠিত 'চট্টল হিতসাধিনী সভা' বঙ্গভঙ্গবিরোধী ও ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে কবি শশাঙ্কমোহন সেন, কাজেম আলী মাস্টার, মহিমচন্দ্র দাশ, বিপিনবিহারি চৌধুরী কৃতী মানবের সম্মানে ভূষিত হন। ১৯২০ সালে কাজেম আলী মাস্টার, মহিমচন্দ্র দাশ, অম্বিকা চক্রবর্তী, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মাওলানা নজির আহম্মদ প্রমুখ কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেন। কংগ্রেস কর্তৃক গৃহীত অসহযোগ আন্দোলন বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলের ছাত্ররা প্রথম ক্লাস বর্জন করে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ধর্মঘট ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সভাপতিত্বে সমাবেশের আয়োজন করে।
দীপ্যমান উল্লেখ্য ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রিকতায় উজ্জীবিত হয়। মাস্টারদা সূর্য সেন গোপন বিপ্লবী দলের উন্মেষ ঘটিয়ে অসহযোগ আন্দোলনকে বেগবান করেন। স্বল্প পরিসরে বিশদ ইতিহাস বিশ্নেষণ দুরূহ ব্যাপার। আগামী প্রজন্মের বোধে এসব সত্যপ্ররোহ সুস্পষ্ট প্রমূর্ত করার লক্ষ্যে ইতিহাস-উপাদান দুর্নিবার প্রক্ষালিত হবে, নিঃসন্দেহে তা বলা যায়। ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ পটভূমি রচনার পেছনে রয়েছে চট্টগ্রামের এক সমুজ্জ্বল সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। ১৯৪৬ সালে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ মদদে কলকাতা, বিহার, নোয়াখালীসহ অন্যান্য অঞ্চলে যখন ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষবাষ্প পুরো অঞ্চলকে আতঙ্কিত ও কলুষিত করেছিল, তার বিস্তার প্রতিরোধে চট্টগ্রামের প্রবীণ ও তরুণ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে সংঘটিত অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।
চট্টগ্রামে রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রথম সফল উদ্যোগ ছিল অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও অন্যান্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ১৬ জন দ্বীপান্তরিত রাজবন্দির সংবর্ধনা। এ সংবর্ধিত অতিথিদের নৈশভোজে আপ্যায়ন করে বিখ্যাত হয়েছিলেন প্রবাদপুরুষ আবদুল হক দোভাষ। ১৯৪০ সালের পর দ্রুততর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালে মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা, কমিউনিস্ট পার্টিসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখার মনোরথতুল্য ব্যঞ্জনা সূচিত করে। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ বেনিয়ার মদদে নির্মম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রশমনে এবং উদারনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী সমাজ-সংস্কৃতসেবীদের আন্দোলনকে অধিকতর জোরালো করার প্রক্রিয়ায় সার্থক প্রয়াস ছিল নজরুলজয়ন্তী উদযাপন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবুল ফজল ও মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে যথাক্রমে সভাপতি ও সম্পাদক করে উদযাপন পরিষদ বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা প্রণয়ন করে।
দলমত-সম্প্রদায় নির্বিশেষে প্রায় সবার সমন্বিত প্রতিনিধিত্বে দাঙ্গাবিরোধী জেলা কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আহম্মদ সগীর চৌধুরী, চট্টগ্রামের প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট রফিউদ্দীন সিদ্দিকী এবং আবদুল হক দোভাষের মতো মনন-প্রগতি-মানবিক-অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব তাদের বিমোচিত কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গামুক্ত রাখতে অভিনব ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ফলস্বরূপ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই পূর্ব বাংলার প্রায় সব অঞ্চলে আতঙ্কিত হিন্দুদের দেশত্যাগের যে ব্যাপক প্রবাহ পরিলক্ষিত হয়েছিল, চট্টগ্রাম ছিল তার ব্যতিক্রম। মূলত চট্টগ্রামে নিরর্থক বর্বরতার বিরুদ্ধে এই নিরুপদ্রব অবস্থা নির্মাণ ছিল ভাষা আন্দোলনের বৃত্তাভাস পাদপীঠ।
আমাদের উপলব্ধিতে এটি স্পষ্ট, সামাজিক জীব হিসেবে বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষের সব সৃষ্টির সমষ্টির বিকল্প হচ্ছে সংস্কৃতি। সমাজের মৌলিক কাঠামো বা উৎপাদন ব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক পর্যায়কে অভিষিক্ত করার ভিত্তিতে উপরি-কাঠামো তথা জীবনযাপন সম্পর্কে ধ্যান-ধারণা, সামাজিক মূল্যবোধ, রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার, শিক্ষা, ধর্ম, দর্শন, আইন, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয় সংস্কৃতির প্রধান উপাদান হিসেবে সর্বতোনিরখা। সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, সংস্কৃতি হলো 'সামগ্রিক পরিবেশের মানব-সৃষ্ট অধ্যায়'। অর্থের ভিন্নতা সত্ত্বেও সভ্যতা ও সংস্কৃতি সমার্থক হিসেবে বিবেচিত। কবিগুরু রবিঠাকুরের ভাষায়- 'সভ্যতা হলো একটি হীরার টুকরো, আর তা থেকে বিচ্ছুরিত আলো হলো সংস্কৃতি।' সভ্য সমাজের উদগাতা হিসেবে সংস্কৃতির মৌল বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোচনা ব্যতিরেকে চট্টগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা আন্দোলনের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক স্বরূপ উন্মোচন অতীব জরুরি। বিরূপ পরিপূর্ণতায় খণ্ডিত ইতিহাস জ্ঞাননির্ভর সমাজ নিরীক্ষায় বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।
মহান একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য শোককে শক্তিতে রূপান্তর; অন্যায়-অবিচার, নির্যাতন-নিপীড়ন, মাথা নত না করে সার্বিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের পক্ষে সম্ভাব্য উচ্চকণ্ঠে আপসহীনতার বিরুদ্ধে কঠিন সত্যের উত্থিত সমুদ্ভব। 'পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা না উর্দু' শিরোনামে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের কর্ণিকা প্রথম পুস্তিকাটি প্রকাশের উদ্যোক্তা ছিলেন চট্টগ্রামের আরেক খ্যাতিমান পুরুষ অধ্যাপক আবুল কাসেম। এ বইয়ের মুখবন্ধে অধ্যাপক আবুল কাসেম লিখেছিলেন, 'বাংলা ভাষাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, আদালত ও অফিসের ভাষা।' এ মাস থেকেই জাতি শিক্ষা নিয়েছে সব অন্ধত্ব, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সর্বজনীন মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠার।
জাতির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন অধ্যায়ে শুধু উপমহাদেশে নয়, বিশ্ব-ইতিহাসেও চট্টগ্রাম সমাদৃত অনন্য, উজ্জ্বল ও প্রত্যয়ী ভূমিকার জন্য। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক 'আজাদী'র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আলহাজ মোহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার, তার প্রতিষ্ঠিত কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস থেকে মুদ্রিত কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী রচিত একুশের প্রথম কবিতা সংশ্নিষ্ট নিদারুণ নিপীড়ন, নির্যাতনের বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যা আমার অনেক নিবন্ধে ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। আজকের দিনে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠায় এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তার নেতৃত্বে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ বিসর্জনকারী সব শহীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়