সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যম 'ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায় আরও উদার হচ্ছে কিউবা'- শিরোনামে একটি সংবাদ অনেকের মনেই বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে। কিউবার বিভিন্ন শিল্প খাতে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা অনুমোদন করা হচ্ছে। ফিদেল কাস্ত্রো কিউবাতে যে ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে এ ধরনের উদারতা চর্চা করা হবে- এমনটি ভাবা ছিল প্রায় অসম্ভব। এখন কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত এ অর্থনীতিতে এটা বড় ধরনের সংস্কার হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ফিদেল কাস্ত্রো এমনকি তার ভ্রাতা রাউল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগের ব্যাপ্তি ঘটানো অনেকের দৃষ্টিতেই ছিল অসম্ভব। কিউবার শ্রমমন্ত্রী মার্তা এলেনা ফেইতো জানিয়েছেন, কিউবার ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগের সংখ্যা ১২৭ থেকে বেড়ে ২০০০ অতিক্রম করেছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, অল্পকিছু শিল্প শুধু রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত থাকবে। নভেল করোনাভাইরাস মহামারি ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে গত বছর কিউবার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছর দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ১১ শতাংশ। তিন দশকের মধ্যে এই সংকোচনের হার সর্বোচ্চ। অবশ্য আমরা যদি ভাবি, অর্থনৈতিক সংকোচনের মাত্রা কেবল কমিউনিস্ট শাসিত কিউবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, বিষয়টি এমন নয়। পাশ্চাত্যের অনেক উন্নত ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র একই ধরনের সংকোচনের কবলে পড়েছে। কিউবার জনগণ এখন তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, তখনও আমরা দেখেছি সোভিয়েত ইউনিয়নে সাধারণ ভোক্তারা তাদের চাহিদা অনুয়ায়ী দৈনন্দিন ব্যবহূত বা ভোগের প্রয়োজনে পণ্য সামগ্রী ক্রয় করতে পারেননি।
কিউবার শ্রমমন্ত্রী ফেইতো জানিয়েছেন, ১২৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতের আওতার বাইরে থাকবে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানগুলো এতে থাকছে, তা স্পষ্ট করে বলেননি তিনি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেছেন, এ সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগ ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত করা। এতে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। বিশেষজ্ঞের মতে, ধীরে ধীরে অর্থনীতি উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে এটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা দেবে। যেসব পরিবার বা ব্যক্তি তাদের ছোট ব্যবসাগুলো মাঝারি পর্যায়ে উন্নীত করতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে অর্থনীতির চেহারা বা কাঠামো কী রূপ ধারণ করবে, সে সম্পর্কে কমিউনিস্ট বিপ্লবের নেতারা সুনির্দিষ্টভাবে কোনো নির্দেশনা দিতে সক্ষম ছিলেন না। কার্ল মার্কসের লেখায় সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সংগঠন সম্পর্কে তেমন কিছু দেখা যায় না। এটা সত্য যে, তিনি ব্যক্তিমালিকানাহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ভেবেছিলেন। তবে বিপ্লব-উত্তরকালে কোনো দেশেই রাতারাতি ব্যক্তিমালিকানামুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয় না। কার্ল মার্কস তার 'প্রিটিক অব গোথা প্রোগ্রাম' নামক পুস্তিকায় উল্লেখ করেছিলেন, 'সমাজতান্ত্রিক সমাজে বৈষম্য থাকবে, সমাজকে সম্পূর্ণ বৈষম্যমুক্ত করা সম্ভব হবে না, অন্তত একটি ঐতিহাসিক কাল পর্যন্ত। এই বৈষম্য থাকবে কায়িক শ্রম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের মধ্যে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে।' কেন এই বৈষম্য থাকবে তাও তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে সমাজতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব হচ্ছিল, সেসব দেশে অর্থনীতি-সংক্রান্ত একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল, এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পণ্য সম্পর্ক কতটুকু থাকবে। উদাহরণস্বরূপ গ্রামের কৃষক পরিবারগুলো যৌথ খামারের বাইরে হাঁস-মুরগি অথবা পশুপাখি লালন করে। পশুপাখির মধ্যে গরু-ছাগল ও ভেড়া থেকে দুধও পাওয়া যায়। এগুলোকে কৃষকরা স্বাধীনভাবে বেচাকেনা করতে পারবে কিনা? যদি এই অতি প্রাথমিক ব্যক্তি উদ্যোগকেও নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এক ধরনের 'ব্ল্যাক মার্কেট' সৃষ্টি হয়েছে। যে কৃষকের হাতে ছয়টি মুরগির ডিম উদ্বৃত্ত আছে, সেগুলো চুপিসারে বিক্রয় করার জন্য রাতের বেলা অন্য কৃষকের ঘরের দরজায় টোকা মারবে। কৃষকদের এই 'প্রবৃদ্ধিকে পেটি বুর্জোয়া' চরিত্র বলে নিন্দা করা যায়। কিন্তু একে আইন করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয় না। তাই একটি সমাজতান্ত্রিক দেশে পণ্য সম্পর্ক কতটুকু বিস্তৃত হবে, তা নির্ণয় করা সত্যই দুরূহ।
কিউবা বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিউদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করেছে। কারণ এর ফলে সমাজে বৈষম্য বাড়বে এবং সামষ্টিক চেতনা ব্যক্তি চেতনার কাছে মার খাবে। ফিদেল কাস্ত্রো তার ভাষণে বারবার স্বার্থপর ব্যক্তিতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তে সমষ্টিগত বা যৌথ চেতনার মানবিক গুরুত্ব তুলে ধরতেন। ইউনিভার্সিটি অব হাভানার অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো টরেস বলেন, ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার সুযোগ বৃদ্ধি- এ নীতিটি অবশ্যই ভালো সংবাদ। তবে এটা অনুমোদনে অনেক দেরি হয়েছে বলে আক্ষেপ করেন তিনি। কিউবার অর্থমন্ত্রী আলেজান্দ্রো গিল এক টুইটে লেখেন, কর্মসংস্থান চাঙ্গায় এ সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। কিউবায় যেসব হাজার হাজার ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিতগুলো বাদে বাকি ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোট ব্যবসাগুলো চালান মূলত কারিগর, ট্যাক্সি ড্রাইভার ও দোকানদাররা। বেসরকারি খাত কিছুটা উন্মুক্ত হওয়ার পর সেখানে ছয় লাখ মানুষ যুক্ত হয়। কিউবার লোক সংখ্যা ১ কোটি ১২ লাখ। উল্লিখিত ৬ লাখ মানুষ মোট শ্রমশক্তির ১৩ শতাংশ। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার বড় একটি অংশই মূলত কিউবার পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু মহামারি ও অবরোধের কারণে তা সংকটপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন দেশটিতে ধীরে ধীরে যাত্রা শুরু করেছে। তবে প্রতিদিনের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এই সংস্কার দৃশ্যমান চিত্র প্রদর্শন করতে কিছুটা সময় নেবে।
কিউবার অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে বিপ্লব-উত্তরকালে প্রায় সব সময় সংকটাপন্ন ছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামার সময় দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়। দুই দেশ দূত বিনিময় করে। ওই সময় কিউবার প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাউল কাস্ত্রো। দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ফলে মার্কিন নাগরিকদের জন্য কিউবা সীমান্তে বিধিনিষেধ শিথিল হয় এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন খাত শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ওবামার এই উদ্যোগ বন্ধ করে দেন।
এখন দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান সব কমিউনিস্ট দেশই চীনের পথে হাঁটছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাউস। এখন যুক্ত হতে যাচ্ছে কিউবা। ব্যতিক্রম হিসেবে থাকল উত্তর কোরিয়া। এই সংস্কার এবং অর্থনীতি উন্মুক্তকরণ নিয়ে মার্কসবাদী তত্ত্বে বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে। মার্কস অর্থনীতির পরিকাঠামো এবং উপরিকাঠামোর কথা বলেছেন। উপরিকাঠামো যেমন- সাহিত্য, শিল্পকলা, বিচার ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা পরিকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। কিন্তু পরিকাঠামো স্থির কোনো বিষয় নয়। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এবং গোটা অর্থনীতিজুড়ে পরিবর্তন এবং অন্যান্য রূপান্তর উপরিকাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে। এর ফলে বিদ্যমান উৎপাদন সম্পর্ক উৎপাদন কাঠামোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। এই অসংগতি সমাজ বিপ্লবের সম্ভাবনা অনিবার্য করে তোলে।
আজ পর্যন্ত যেসব দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখল করছে সেসব দেশ শিল্পে অনগ্রসর, অনুন্নত, দরিদ্র দেশ। এক বিবেচনায় বলা যায়, এই দেশগুলো পৃথিবীর গ্রাম। আর পাশ্চাত্যের দেশগুলো পৃথিবীর শহর। এ রকম অবস্থায় অনুন্নত দেশে সমাজতন্ত্রের মতো একটি উন্নত সমাজব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ পুঁজিবাদের স্তর পার না হয়েই সমাজতন্ত্র নির্মাণের প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল। তাই এখন চীনসহ বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে পণ্য সম্পর্ক বা বাজারব্যবস্থা বিকশিত করার জন্য সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে উৎপাদিকা শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজের পরিকাঠামো উন্নততর হচ্ছে। এতে একটি সময়ে সত্যিকার সমাজতন্ত্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এ ছাড়া পরিবেশ, নারীর মুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বময় যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি এবং অভিন্ন সম্পদের ব্যাপ্তি সমাজতন্ত্রকে অনিবার্য করে তুলবে। এখন যারা মনে করছেন চীনসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো উল্টোপথে চলছে, তারা বুঝতে পারছেন না কেন এ দেশগুলো সংস্কার এবং উন্মুক্তকরণের নীতি গ্রহণ করেছে। আমরা কি ভাবব মাও, হো চি মিন এবং কাস্ত্রোর সহযোদ্ধারা বিপ্লবের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন!
অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ