এক ঠিকাদারকে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া যে উচিত নয়, শেষ পর্যন্ত সরকারের অন্যতম প্রধান একটি দপ্তর তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে দেখে আমরা আশান্বিত। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- দেশের বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর খতিয়ে দেখছে, কী কী কারণে একই প্রতিষ্ঠান অনেক প্রকল্প পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম ও শর্তে পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে। অবশ্য উপলব্ধি যে স্বতঃস্ম্ফূর্ত নয়, তাও মনে রাখতে হবে। আমাদের মনে আছে, গত বছর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এমন নির্দেশু দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন যে- কোনো ঠিকাদারকে একই সঙ্গে একাধিক প্রকল্পের কাজ দেওয়া যাবে না এবং একটি প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলেই পরে সংশ্নিষ্ট ঠিকাদার আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। এক ঠিকাদারের একাধিক প্রকল্পপ্রাপ্তি কতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই রয়েছে তার উদাহরণ। এতে বলা হয়েছে, সওজে নিবন্ধিত ঠিকাদারের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় সাড়ে আটশ। বর্তমানে এই সংস্থার আওতায় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার যেসব প্রকল্প চলমান, তার মধ্যে শীর্ষ ২০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই পেয়েছে কমবেশি ১৮ হাজার কোটি টাকার কাজ। সওজের চিত্র থেকেই বোঝা যায়, সরকারি অন্যান্য দপ্তরেরও পরিস্থিতি কী। যে কারণে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও আমরা একাধিকবার বলেছি যে, এমন ভারসাম্যহীনতা ভাঙা দরকার। এ বিষয়ে আমাদের সন্দেহ সামান্য যে- প্রকল্পপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে গুটিকয়েক ঠিকাদারির দাপট দূর করা গেলে একদিকে যেমন সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে, অন্যদিকে গড়ে উঠবে নতুন নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আমরা জানি, ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগীর সংখ্যা যত বাড়ে; কাজের মান, অর্থের সাশ্রয় ও উদ্ভাবনের পরিসর তত বাড়তে থাকে। একাধিপত্যের কারণে দেখা যায়, বছরের পর বছর প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে কেবল ঠিকাদারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে। একসঙ্গে একাধিক প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে কোনোটিই ঠিকমতো সম্পন্ন হয় না। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও আমরা এমন দুর্ভাগ্যজনক চিত্র দেখেছি। আমরা মনে করি, যদি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একসময়ে একাধিক কাজ না পায়, তাহলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি সম্ভব। ঠিকাদারির ক্ষেত্রে একাধিপত্যের বিরূপ প্রভাব আমরা আন্তর্জাতিক অর্থকরী সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে আসতে দেখেছি। আমাদের মনে আছে, বিশ্বব্যাংকের পক্ষে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত 'অ্যাসেসমেন্ট অব বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে মাত্র ৩০ শতাংশ ঠিকাদার সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতে পারে। তার মানে, ৭০ শতাংশ ঠিকাদারই সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতে পারে না। আর প্রকল্প বাস্তবায়ন বা ঠিকাদারি কাজ সম্পন্নের সময় যত বাড়তে থাকে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যয় কত বাড়তে থাকে, তার ভূরি ভূরি প্রমাণ দৃষ্টি মেললেই পাওয়া যায়। আমরা মনে করি, এ পরিস্থিতির অবশ্যই অবসান হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, দোষ কেবল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নয়। সরকারের যেসব সংস্থা ঠিকাদারি কাজের যথার্থ তদারকির মাধ্যমে সময়মতো কাজ শেষ করা নিশ্চিত করে না; যারা বরং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়; তারাও এ পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না। একই ঠিকাদারের একই সময়ে একাধিক কাজ বা প্রকল্পপ্রাপ্তির 'রাজনৈতিক' দিকটিও ভুলে যাওয়া চলবে না। রাজনৈতিক চাপের কারণেই এ ধরনের অঘটন যে ঘটে থাকে, তার প্রমাণ আমরা কেন্দ্রে ও প্রান্তে প্রায়ই দেখি। ফলে সওজের উপলব্ধিকে আমরা সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানিয়ে বলতে চাই, কেবল নিয়ম বদলানোই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যথাযথ নজরদারিও জরুরি। কেবল সওজ নয়, ঠিকাদারি-সংশ্নিষ্ট যে কোনো দপ্তর থেকে যদি আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে নজরদারি করতে পারে, তাহলে বিদ্যমান ব্যবস্থাতেই পরিস্থিতির উন্নয়ন নিশ্চিতভাবে সম্ভব।

বিষয় : এক ঠিকাদারের বহু প্রকল্প

মন্তব্য করুন