মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বক্তব্যে বিদেশের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপনের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিগত প্রায় দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানটি ক্রমশ দুর্বল হয়েছে, যা তিনি পুনরুদ্ধারের আভাস দিয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখনও রাশিয়াকে মনে করা হয়, সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে বৈদেশিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণের বিষয়ে বাইডেন প্রশাসন তৎপর হওয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু এখানে বর্তমানে শুধু রাশিয়া নয়, বিশ্ব অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনকেও হিসাবে ধরে এগোতে হচ্ছে। বাইডেন দায়িত্ব গ্রহণের পর তার শক্তিশালী বৈদেশিক নীতির ধাক্কাটা চীনের কাছ থেকে খেয়েছেন। ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় বাইডেনের বৈদেশিক নীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। চীন জাতিসংঘের নিন্দা প্রস্তাব শুধু বিরোধিতা করে তা বাতিলই করেনি, চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের ঘটনাকে 'মন্ত্রিপরিষদের বড় ধরনের রদবদল' হিসেবে প্রচার করে মিয়ানমারের পক্ষে আরও দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান দিয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য শুধু মিয়ানমারে নয়, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কায়ও লক্ষণীয়। এসব দেশে চীনের পরে যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশকেন্দ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্র নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ভারত ও চীন এগিয়ে। বাংলাদেশের ওপর তীক্ষষ্ট নজরদারির প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র আগের অবস্থান থেকে সরে গেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিয়ামকসমূহ নির্ধারণে ভূমিকা পালন করে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস অফিস। লক্ষণীয় যে, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এখন অনেকটাই রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের কোনো মন্তব্য সর্বশেষ কবে খবর হিসেবে ছাপা হয়েছে, তা পত্রিকায় খুঁজতে গেলে অনেক পেছনে যেতে হবে। সেই অবস্থার পরিবর্তনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্ব আলোচনায় আসতে পারে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বের মান ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকে জানিয়ে দিয়েছেন।
অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করার মতো ইচ্ছা, সময় কিংবা সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের এখন নেই। সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত এবং চীনের নীতি-কৌশল হিসাব-নিকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-কৌশল প্রণয়ন করা হচ্ছে। বাইডেনের সময়ে সেই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রণয়নে বাইডেন প্রশাসনের আহামরি কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি সময়-সুযোগ পেলে দেশি-বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে নালিশ জানিয়ে আসছে। বিএনপি পুরোনো সম্পর্কের সূত্র ধরে বাইডেন প্রশাসনের কাছে নালিশ জানাতে পারে। তবে এক্ষেত্রেও বাইডেন প্রশাসন উচ্চ স্বরে কিছু বলবে বলে মনে হয় না। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের যে সম্পর্ক ছিল, বাইডেনের সময়েও একই রকম থাকতে পারে। ট্রাম্পের পূর্বসূরি বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গাঁটছড়া সম্পর্ক তৈরি হয়। ওবামা তার মেয়াদের শেষ দিকে ভারত সফর করেছিলেন। ভারতে নরেন্দ্র মোদি তখন সরকার গঠন করেছিলেন। মূলত সেই সময়েই বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার তীক্ষষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে।
বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অংশ হিসেবে জিএসপি স্থগিত আদেশ প্রত্যাহারের ব্যাপারে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারে। এই শুল্ক্ক প্রত্যাহার করলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা ১৬ শতাংশ কম দামে তৈরি পোশাক কিনতে পারে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরানো জরুরি। মিয়ানমার সরকারকে এই কাজে রাজি করাতে চীনের ভূমিকা বড় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও কম নয়। বাংলাদেশ এই কাজে যুক্তরাষ্ট্রকে ভালোভাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। বারাক ওবামার সময়কালে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৩ বছর আগে করা এই চুক্তির কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ছে না। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপির মাধ্যমে বাংলাদেশে বড় ধরনের অবকাঠামোগত প্রকল্প হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানি নেই। ভারত এবং অন্যান্য দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাংলাদেশে এলে মূল্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিনিয়োগ করলে বাংলাদেশের মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেত। টিকফার সূত্র ধরে বাংলাদেশ বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে পারে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে 'সতর্কতার' সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়াবলি নিয়ে অগ্রসর হতে পারে। সতর্ক থাকতে হবে এ জন্য যে, বিশ্বের ক্ষমতাধর এ রাষ্ট্রটি কোনো একপর্যায়ে গিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব সচেতন এবং প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে।
গবেষক ও বিশ্নেষক
asumanarticle@gmail.com

বিষয় : বাইডেন প্রশাসন ও বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন