গত এক যুগে রাজধানী ঢাকায় নতুন কয়েকটি ফ্লাইওভার হয়েছে। অনেক বেহাল সড়ক নতুন চেহারায় ঝকঝক করছে, অনেক ফুটপাত প্রশস্ত হয়েছে। সড়কে যানবাহন চলার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু এক যুগের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা আর কারিগরি সক্ষমতার সাফল্য যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে বিশৃঙ্খল পাবলিক বাস সার্ভিসের কাছে। ঠিক এই চিত্রটাই ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্জনের ক্ষেত্রেও।

গত বারো বছরে মোটামুটি শক্তিশালী টেলিযোগাযোগ ট্রান্সমিশন অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এই অবকাঠামোকে গতিশীল করার জন্য যে জ্বালানি দরকার তাও নিশ্চিত করা হয়েছে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়িয়ে। কিন্তু মোবাইল ফোন গ্রাহক বলুন কিংবা ব্রডব্যান্ডের গ্রাহক বলুন, নায্য সেবা পাচ্ছেন না। কারণ এখানেও যারা সেবার নেটওয়ার্ক তৈরি করে সেবা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত, সেই মোবাইল ফোন অপারেটর কিংবা ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের সেবার মান রাজপথের পাবলিক বাস সার্ভিসের মতোই। এখানেও আছে সড়কের মতোই বিশৃঙ্খলা এবং বেপরোয়া ওভারটেকিং প্রতিযোগিতা। পরিবহন খাতের মতোই লাইসেন্সধারী অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী, দালালদের দৌরাত্ম্য। 

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিপুল বিজয়ের বড় একটি কারণ ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নির্বাচনী ইশতেহার। শেখ হাসিনার টানা তিন মেয়াদে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের দ্রুতগতিতে ট্রান্সমিশন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইথের জোগান নিশ্চিত করা হয়েছে। অনলাইনে নিজেদের তথ্যভান্ডার তৈরি করে নিরাপত্তার নিশ্চয়তার জন্য অত্যাধুনিক ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার জন্য তৃণমূলে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম মূল্যে স্মার্ট ডিভাইস যেমন ল্যাপটপ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বপ্নের সঙ্গে একাত্ম হতে দেশের গৌরব বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ কক্ষপথে পৌঁছৈ দেওয়া হয়েছে।   

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের নেওয়া দূরদর্শী ও প্রয়োজনীয় অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে আমলাতন্ত্রের লালফিতার জটিলতার কাছে বার বার হোঁচট খেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলাও তৈরি করা হয়েছে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়েছে টেলিযোগাযোগ খাতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো। বিটিসিএল দেশের টেলিযোগাযোগ ট্রান্সমিশন সেবায় নেতৃত্বের আসনে থেকেও ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে। টেলিটক কোমর সোজা করেই দাঁড়াতে পারেনি আজও। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি (বিএসসিসিএল) ফাঁকা মাঠে শুভঙ্করের ফাঁকির লাভের অঙ্কের হিসাবেই সন্তুষ্ট। বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড ব্যাপক সুবিধা নিয়েও ব্যবসার বাজারে কোনো সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানেরই আস্থা অর্জন করতে পারেনি। টেলিফোন শিল্প সংস্থা টেশিস মৃতপ্রায় অবস্থায় চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

আমলতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে না রেখে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোতে পেশাদার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ যদি ২০১০ সালেই নেওয়া হতো, তাহলে টেলিযোগাযোগ খাতের সেবার চালিকাশক্তি হতো রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোই, আর এ খাতের উপার্জনও দেশে থাকত। তাহলে বারো বছর পথ চলার পর আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশে গ্রাহক সেবার মানকে দেশের নাগরিক সেবায় 'নিকৃষ্টতম' পাবলিক বাস সার্ভিসের সঙ্গে তুলনা করতে হতো না।

আমলাতন্ত্রের মারপ্যাঁচের কারণে তৃণমূলে ইউনিয়ন পরিষদ তথ্য সেন্টার এবং পরে ডিজিটাল তথ্য সেন্টার স্থাপন হলেও সেগুলো কয়েক বছরের মধ্যেই বেশিরভাগই অকার্যকর, এমনকি অনেক জায়গায় নিরুদ্দেশও হয়ে গেছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালুতে বাস্তব অবস্থার চেয়ে অগ্রসর প্রযুক্তির বদলে হারিয়ে যাওয়ার পথে থাকা পুরোনো প্রযুক্তি নির্বাচন করার কারণে সে প্রকল্পটিও মুখ থুবড়ে পড়েছে। ডিজিটাল পোস্ট অফিস স্থাপনের চিত্রের একটি বাস্তব রূপ পাওয়া গেছে চাঁদপুরের মতলবে। সেখানে কাগজেকলমে পোস্ট অফিসে পাকা অবকাঠামো, ইন্টারনেট সংযোগ, ল্যাপটপ থাকলেও বাস্তবে খড়ের ছাউনির ঘরে ভাঙা টেবিল-চেয়ার ছাড়া আর কিছুই নেই। শিক্ষার্থীদের মাঝে কমমূল্যে ল্যাপটপ বিতরণের প্রকল্প দুর্নীতির কারণে শুরুতেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গ্রামে গ্রামে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট দেওয়ার জন্য নেওয়া প্রকল্প ইনফো সরকার-৩ বাস্তবায়নে বার বার জটিলতার সৃষ্টি এবং সময় বাড়ানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি শেষ হয়েও হয়নি। ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এর বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাস্তবতার সত্যিকারের চিত্রটা এখনও সাধারণ মানুষের অজানা। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য 'লার্নিং-আর্নিং' কিংবা 'লিভারেজিং আইসিটি ফর এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড গ্রোথ' বা এই জাতীয় আরও একাধিক প্রকল্পের বাস্তব সুফল কী তাও সাধারণের অজানা।

এর মধ্যেও স্বস্তির খবর আছে। বিটিসিএল ঢাকায় অত্যাধুনিক ট্রিপল প্লে নেটওয়ার্ক চালু করেও সেই সেবা গ্রাহকের কাছে পৌঁছৈ দিতে পারেনি বছরের পর বছর ধরে। আরও প্রায় পাঁচ বছর আগে স্থাপন করা এই ট্রিপল প্লে নেটওয়ার্কের এই সেবা সম্প্রতি ব্যাপক ভিত্তিতে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে। আরও কিছু ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বিটিসিএলের গ্রাহক সেবার মানে উন্নতি দেখা যাচ্ছে, আগের অপচয়ের ধারা থেকে বের হয়ে বিটিসিএলের নতুন গতিময় যাত্রার একটা ভালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এটাই একমাত্র স্বস্তির খবর।

ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রায় নিঃসন্দেহে বড় অবদান বেসরকারি খাতের। টেলিযোগাযোগ ট্রান্সমিশন অবকাঠামো গড়ে তুলতে দুটি বেসরকারি এনটিটিএন অপারেটরের অর্জনও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। দেশি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত দুটি বেসরকারি কোম্পানিই টেলিযোগাযোগ খাতে এখন পর্যন্ত সফল দেশীয় প্রতিষ্ঠান যারা ডিজিটাল বাংলাদেশের পথ চলায় অবশ্যই গর্বিত অংশীদার।

অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত চারটি মোবাইল অপারেটরের মাধ্যমেই দেশে বিস্তৃত টেলিযোগাযোগ সেবার গ্রাহক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং তার সুফল যতটা গ্রাহকের কাছে গেছে, তাও মোবাইল ফোন অপারেটরদের হাত ধরেই। অর্থাৎ টুজি থেকে ফোরজি যুগে প্রবেশের যে গর্ব আমরা করছি, তা বাস্তবায়নের পুরোধা কৃতিত্ব মোবাইল ফোন অপারেটরদের। গ্রাহক সেবার মান নিয়ে নিশ্চয়ই প্রশ্ন আছে, কিন্তু তার পরও এখন যে ফোরজি সেবার যুগে বাংলাদেশের প্রবেশ, তাও সম্ভব হতো না যদি বিদেশি বিনিয়োগের তিনটি মোবাইল অপারেটর বড় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে না আসত।

সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের যে পরিকল্পনা ও দর্শন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলতে কার্যত সফল হয়েছে বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটররাই। শুধু গ্রাহক সেবায় প্রযুক্তির রূপান্তর এবং সম্প্রসারণ নয়, টেলিযোগাযোগ খাতে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ, দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরি, সেবাদানে সহযোগী দেশীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বহুমাত্রিক কর্মসংস্থানের সুযোগও এসেছে তিন শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটরের হাত ধরেই। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি পণ্য সরবরাহ করা বিদেশি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানও অসামান্য। তারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের বাজারে নতুন ও অগ্রসরমান প্রযুক্তি পণ্য সুলভ মূল্যে না নিয়ে এলে আজকের অর্জন সত্যিই সম্ভব হতো না। এই ভেন্ডরদের মাধ্যমেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃস্টি হয়েছে এবং হচ্ছে।

সবশেষে আবারও গ্রাহক সেবার প্রসঙ্গটিই আসে। এতকিছুর পর গ্রাহকরা যখন বার বার কলড্রপের শিকার হন, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে বার বার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, সরকারি খাতায় সুলভ মূল্যের ইন্টারনেট অপারেটরদের কাছ থেকে বেশি মূল্যে কিনতে বাধ্য হন, ভ্যালু অ্যাডেড সেবা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন, তখন একটি প্রশ্নই গুরুতর হয়ে যায়- ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে এতদূর যাত্রায় এসেও গ্রাহক সেবার মানের এই চিত্র কেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে যেতে হবে আমাদের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির কাছে। গ্রাহক সেবার মান নিশ্চিত করতে তারাই দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা। এই সংস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কিংবা পারছে না, সেটা অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ।

সাংবাদিক

মন্তব্য করুন