জ্ঞানময়ীর আগমন তিথিতে প্রকৃৃতি নতুন সাজে সজ্জিত। গাঁদা, ডালিয়া, পলাশ, কুন্দসহ নানা ফুলের ঘ্রাণে প্রকৃতি আমোদিত। নিশ্চয়ই শুক্লা পঞ্চমীর পুণ্য তিথিতে শ্বেত-শুভ্র কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবীর আবাহনের কারণে এই পুষ্পরাজি প্রস্ম্ফুটিত। ঘণ্টা, কাঁসর আর শঙ্খনিনাদে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপ। ঊষালগ্ন থেকেই আনন্দলোকে-মঙ্গলালোকে উদ্ভাসিত ধূপ-ধুনোর গন্ধে মাতোয়ারা ধরণীতে বেজে উঠবে শান্তির মোহনীয় সুর। ব্রাহ্ম মুহূর্তে আবাহন সম্পন্ন হয় দেবীর শঙ্খে শঙ্খে মহিমাময় সুরে। রাজহংস সমভিব্যাহারে দেবী আসছেন। আমরা রোমাঞ্চিত হৃদয়ে শ্রদ্ধা-ভক্তির পুষ্পাঞ্জলি লয়ে তার শ্রীচরণ দর্শনের প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ। তাকে কেন্দ্র করে আমাদের অন্তরে আজ অপরিমেয় আনন্দ-অনুভূতির উদ্ভাস ছড়িয়ে পড়ছে। তার সেই আগমনী বার্তা নিনাদিত হচ্ছে অনিলে, সলিলে, নভোনীলে। এবার বৈশ্বিক মহামারি করোনার জন্য বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় পূজা আগের বছরগুলোর মতো হচ্ছে না। তবে পারিবারিকভাবে গৃহে গৃহে বিদ্যার্থীরা, পূজারিরা সাধ্যমতো আরাধ্য দেবীর বন্দনা করবে। সরস্বতী বৈদিক দেবী। পৌরাণিক যুগ থেকে দেবীর বিগ্রহ আমরা পাই। আদি যুগ থেকেই সরস্বতীর বন্দনা করা হয়। অগ্নি প্রজ্বলিত করে, বেদের মন্ত্র উচ্চারণ করে শ্রদ্ধা জানাতে, তার কাছে ভক্তপ্রাণের মঙ্গল আরতি। ঈশ্বর যে শক্তিরূপে জ্ঞানকে প্রকাশ করেন, তার নামই দেবী সরস্বতী। বেদে সরস্বতী দেবীর যে উল্লেখ আছে, সেখানে তিনি নদীস্বরূপা।

পুরাণে সরস্বতী দেবীর যে বিস্তৃত বর্ণনা আছে তাতে তিনি বিদ্যা, সংগীত, নাট্যকলা, চিত্রকলা, ভাস্কর্যসহ সব ধরনের সৃষ্টিশীল বা সুকুমার শিল্প এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের দেবী। তিনি আমাদের সব ধরনের জ্ঞান দান করেন। সরস্বতী দেবীর গায়ের রঙ শুক্ল বা শুভ্র। শুক্ল তার বসন। সরস্বতী দেবী শ্বেত পদ্মের ওপর উপবিষ্ট থাকেন। তার হাতে পুস্তক ও বীণা। বীণা হাতে থাকে বলে সরস্বতী দেবীর আরেক নাম বীণাপাণি। তার বাহন শ্বেত রাজহংস। সবকিছু মিলে সরস্বতী দেবী সর্বশুক্লা। শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী দেবীর পূজা করা হয় বলে এ পঞ্চমী তিথিকে শ্রীপঞ্চমী তিথি বলা হয়। দুর্গাপূজার সময়ও সরস্বতী পূজা করা হয়। নদী ও দেবীরূপেও সরস্বতীর নামকরণ করা হয়েছে। তিনি বাগ্‌দেবী ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপেও বর্ণিত। সরস্বতী বিশেষভাবে বিদ্যার্থীদের উপাস্য দেবী। তিনি শিল্পকলার দেবীরূপে কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা, নৃত্যশিল্পীসহ কলাকারদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজিত হন। তিনি সর্বশুক্লা, শুচিতা ও পবিত্রতার প্রতীক। তাই যে জ্ঞান অর্জন করতে চায় তাকেও মনে-প্রাণে শুদ্ধ ও পবিত্র হতে হয়। নইলে সত্যিকারের জ্ঞান অর্জন করা যায় না। সরস্বতীর বাহন রাজহাঁসকে জল আর দুধ মিশিয়ে দিলে, দুধ গ্রহণ করে জল ত্যাগ করে।

জ্ঞানী তেমনি জ্ঞানের জগৎ থেকে অসার বস্তু বাদ দিয়ে সার গ্রহণ করেন। সরস্বতী দেবীকে বলা হয়েছে 'জাড্যাপহা'। জাড্য মানে জড়তা। এখানে জাড্য মানে মূর্খতা। অপহা মানে অপনাশকারিণী। সরস্বতী দেবী আমাদের মূর্খতা দূর করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন। সংস্কৃত সাহিত্যে সরস্বতীকে নিয়ে অনেক কাহিনি ও উপাখ্যান রয়েছে। নৈষধচরিত মহাকাব্যে দেখা যায় তিনি স্বয়ং ভীমরাজের রাজসভায় একজন প্রতিভাদীপ্ত উপস্থাপিকা। এমনি আরও অনেক উপাখ্যানে দেখা যায়, অনেক মূর্খ ব্যক্তিও সরস্বতীর কৃপা লাভ করে বিখ্যাত শিল্পী-সাহিত্যিক-মহাকবি হয়েছেন। তাই আমরা বিদ্যা দেবীর শ্রীচরণে প্রার্থনা জানাচ্ছি- তিনি আমাদের অন্তরে ভিতরকার অজ্ঞান শক্তিকে বিনাশ করে শুভশক্তির উদ্বোধন করুন। দেবীর আবির্ভাব তিথিতে এবার বৈশ্বিক মহামারি করোনার জন্য বিদ্যালয়গুলোতে পূজার আয়োজন না হলেও বিদ্যার্থীরা ভক্তিভাবের ডালি সাজিয়ে অন্তরতম প্রদেশ থেকে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করুক। সেই সঙ্গে আমরা যেন সাম্য, মৈত্রী, অহিংসা ও পরার্থপরতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তার সন্তানরূপে নিজেদের পরিচয় দিতে পারি। নিছক উৎসব-আড়ম্বর বড় কথা নয়। আমরা যেন অন্তরে এই বিদ্যাশক্তির উদ্বোধনের মাধ্যমে নিরন্তর ব্যাপৃত রাখতে পারি। সেই সঙ্গে মায়ের কাছে আকুল আর্তি- সাম্প্রতিক বিশ্ব যে বিপর্যয়ে পতিত, তা থেকে আমরা যেন অতিদ্রুত সুস্থ-সুন্দর জীবনে ফিরে আসতে পারি। পীড়িতদের দুঃখে আমরা মর্মে মর্মে সমবেদনা অনুভব করে সহায়তা করতে পারি।

বর্তমান সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দুর্ভাগ্যবশত মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত-মর্মাহত। তাই আমাদের মানবতাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। মায়ের কাছে প্রার্থনা- হে জ্ঞানময়ী দেবী, তুমি আমাদের অজ্ঞানতা নাশ করে জ্ঞানের দিকে পরিচালিত কর; অশুভ থেকে শুভপথে ধাবিত কর; আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে সর্বজনীনতায় উদ্বুদ্ধ কর; অসত্য থেকে সত্য ও শান্তির পথ প্রকাশিত কর; ঘন আঁধার থেকে আলোর দিকে নিয়ে চলো। এভাবে আমাদের সংশয়দীর্ণ হৃদয়ে দিব্যোজ্জ্বল আত্মপ্রকাশ হোক জ্ঞানময়ীর এই মহান আবির্ভাব তিথিতে।

সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : জ্ঞানময়ীকে পুষ্পার্ঘ্য জ্ঞানময়ী কালিদাস ভক্ত

মন্তব্য করুন