পৌরসভা পর্যায়ে চতুর্থ ধাপের নির্বাচনও যেভাবে পূর্ববর্তী নির্বাচনের মতো রক্ত ঝরিয়ে শেষ হয়েছে, তাতে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা দেখেছি, রোববার ৫৫টি পৌরসভায় অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে চট্টগ্রামের পটিয়ায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে এক কাউন্সিলর প্রার্থীর ভাই-ই শুধু নিহত হননি, বরং নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী, লালমনিরহাট সদর, টাঙ্গাইলের কালিহাতীসহ বিভিন্ন পৌরসভায় ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, কেন্দ্র দখলসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনিয়মের অভিযোগে কয়েক স্থানে বিএনপি, স্বতন্ত্রসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের ভোট বর্জনের ঘোষণাও খারাপ উদাহরণ হিসেবে সামনে এলো। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বারবার সংঘাতমুক্ত, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছি। সহিংসতা বন্ধে নির্বাচন কমিশন শুধু প্রতিশ্রুতি ও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। চতুর্থ ধাপের পৌরসভা নির্বাচনের ফল সোমবার যখন আমরা পর্যালোচনা করছি, এ দিনটিতেই বর্তমান কমিশন তার চার বছর পূর্ণ করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া অনেক নির্বাচনেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রে ভোটার কমে যাওয়া ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতাও এ নির্বাচন কমিশনের সময়েই বৃদ্ধি পেয়েছে।

একই সঙ্গে এ কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মতো যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা এর আগে আমরা দেখিনি। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও তার পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমরা জানি, নির্বাচন কমিশনের হাতে অনেক ক্ষমতা। কমিশন চাইলেই যে কারও প্রার্থিতা বাতিল, নির্বাচন স্থগিতসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচন কমিশনকে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই নির্বিকার থাকতে দেখেছি। চতুর্থ ধাপে পৌরসভা নির্বাচনে যে ফল হয়েছে, তাও প্রশ্নবিদ্ধ। ৪৮টি পৌরসভায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। বিরোধী বিএনপি মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে। আমরা মনে করি, নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়মের যে অপসংস্কৃতি বহুদিন ধরে চলে আসছে, তা থেকে বের হতে সর্বাগ্রে নির্বাচন কমিশনকেই তৎপর হতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুষ্ঠু ক্ষমতা বদলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিই হবে। আমরা জানি, এ নির্বাচন কমিশনের আর এক বছর বাকি। এ সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনগুলো এভাবে সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে অনুষ্ঠিত হলে এ জন্য জনআস্থা হ্রাস পাবে। পঞ্চম দফার পৌরসভার র্নির্বাচন এ মাসের শেষদিকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আমরা দেখতে চাইব, এই নির্বাচনে কমিশন যথাযথ ভূমিকা পালন করুক। একই সঙ্গে প্রশাসনেরও নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রত্যাশিত। সংবাদমাধ্যমে এসেছে, রোববারের চতুর্থ দফার পৌরসভার এ নির্বাচনের আগে মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মসিউর রহমান নির্বাচন কমিশনের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন, মাদারীপুরের পুলিশ সুপার নিজের গাড়িতে করে তাকে কালকিনি থেকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন; সেখানে তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে 'অনুরোধ' করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে যেভাবে খবরটি প্রকাশ হয়েছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা মনে করি, নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি সমন্বিত প্রয়াস। নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ় অবস্থান যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা। এমনকি এ ক্ষেত্রে প্রার্থী ও সমর্থকদের দায়িত্বও কম নয়। রোববারের পৌরসভার চতুর্থ দফার নির্বাচনই শুধু নয়; সব নির্বাচনেই অনিয়ম ও সহিংসতার ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে বলে আমরা মনে করি। নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে সংশ্নিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।