আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট-আইভিআই প্রতিষ্ঠার চুক্তি অনুসমর্থনের যে প্রস্তাব সোমবার সরকার অনুমোদন করেছে, তা দেশে নতুন টিকা উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করবে বলে আমরা মনে করি। আমরা জানি, ১৯৯৬ সালের ২৮ অক্টোবর ইউনাইটেড ন্যাশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের উদ্যোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করলেও পূর্ণ সদস্য পদের জন্য মন্ত্রিসভার যে অনুমোদনের দরকার ছিল, এখন সেটিই হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, এর ফলে এখন দেশে টিকা উৎপাদন এবং এ সম্পর্কিত গবেষণায় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোসহ টিকার প্রয়োগ ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও যুগোপযোগী হবে। পাশাপাশি কম দামে টিকা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ এমন সময়ে এ চুক্তি অনুসমর্থন করেছে, যখন আমরা দেখছি চলমান করোনা দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু হয়েছে। সমকালে মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকাদান কর্মসূচির ১৩তম দিনে সোমবার পর্যন্ত ২৩ লাখ মানুষ টিকা নিয়েছেন, যেখানে প্রথম মাসে ৬০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। এটা ইতিবাচক যে, টিকাদানে মানুষের স্বতঃস্ম্ফূর্ত সাড়া মিলেছে। আমরা জানি, সরকার করোনাভাইরাসের টিকা সংগ্রহে শুরু থেকেই তৎপর ছিল। ইতোমধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে পাওয়া অক্সফোর্ডের টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোভ্যাক্স থেকেও এক কোটি ২৭ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে। সুতরাং টিকা নিয়ে কোনো সংকট হবে না বলে আমরাও বিশ্বাস করি। কিন্তু আমরা নিজেরাই যদি দেশে টিকা উৎপাদন করতে পারি, সেটা যেমন নিজেদের চাহিদা পূরণে কাজে লাগবে, তেমনি রপ্তানিরও সুযোগ তৈরি হবে। করোনার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গত বছরের শেষদিক থেকেই বিশ্বের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশে করোনার টিকা প্রয়োগ শুরু হয়। তখন ধনী দেশগুলো বিপুল পরিমাণে অগ্রিম প্রতিষেধক কিনে নেয়। অথচ করোনা থেকে মুক্তি পেতে ধনী-দরিদ্র সব দেশের জন্যই যেভাবে ভ্যাকসিনের সমবণ্টন জরুরি ছিল, বাস্তবে তা হয়নি। আমরা জানি, মানব জাতির ইতিহাসে এত বিস্তৃত মহামারি যেমন আসেনি, তেমনই এত বড় 'বাজার' আগে কখনও দেখা যায়নি। এ জন্য টিকার বিষয়টি যেন নিছক প্রতিযোগিতা ও মুনাফা অর্জনের না হয়, সে জন্য এ সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা সতর্ক করে লিখেছিলাম। এমনকি গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণেও সব দেশে একই সঙ্গে টিকা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি করোনার টিকা যথার্থ অর্থেই বৈশ্বিক সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আমরা মনে করি, দেশে নিজেদের টিকা উৎপাদনে সক্ষমতা তৈরি হলে এ ধরনের সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। আমরা দেখছি, বর্তমান টিকার বাজারে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একইভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে জাতীয় সংকটে আবিস্কার ও গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে, সেদিকেও নজর দিতে চাই। আমরা জানি, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবরেটরি সংকটসহ গবেষণা উপকরণের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এসব অভাব পূরণ করে আন্তর্জাতিক মানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করলে দেশীয় গবেষকরা নানা আবিস্কারে ভূমিকা পালন করতে পারবেন। আমরা দেখেছি, দেশের মেধাবীরা বিভিন্ন দেশে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। এ ক্ষেত্রে দেশে আমাদের কী ঘাটতি রয়েছে, তা দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি সামনে আসবে। সে ক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি ওষুধ তৈরি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা দরকার। জানি না, করোনা কতদিন পৃথিবীতে থাকবে! দীর্ঘ মেয়াদে করোনা রুখতে যেমন পৃথিবীর সব দেশের জন্য কার্যকরী টিকা দরকার, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে টিকা তৈরি হলে সংকট থেকে উত্তরণ সহজ হবে। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আমরা আশা করি।

বিষয় : আইভিআই চুক্তি অনুসমর্থন

মন্তব্য করুন