দেশের বিদ্যুৎ খাতে চাহিদার চেয়ে উৎপাদনক্ষমতা দ্বিগুণ সত্ত্বেও অন্ধকার কেন দূর হচ্ছে না, এর নেপথ্য কারণ উঠে এসেছে বুধবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে। শুধু জনপদেই নয়; শিল্প-কারখানায়ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানহীন নির্মাণকাজের কারণে সঞ্চালন লাইনে ঘটছে দুর্ঘটনাও। একটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ এর দেখভালের দায়দায়িত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি)। এ সংস্থার অধীনে ন্যাশনাল পাওয়ার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন। ২০১৩ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে তো শেষ হয়ইনি; উপরন্তু এ প্রকল্পের ৬ নম্বর প্যাকেজে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক দফায় সময় বেড়ে প্রকল্পের মেয়াদ প্রলম্বিত হয়েছে। এ প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নে ঠিকাদারদের গাফিলতির পাশাপাশি অধিকতর বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত যার বিরুদ্ধে মামলা চলছে, তাকেই এ প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগের বিষয়টি।

এত অর্থ ব্যয়ে যে প্রকল্প নেওয়া হলো, এখন দেখা যাচ্ছে, এ প্রকল্পের পরিকল্পনাতেই ভুল রয়েছে! সঞ্চালন টাওয়ারের পাইলিংয়ে ঘটেছে তুঘলকি কাণ্ড। আরও বিস্ময়ের হলো, নকশা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই মালপত্র ক্রয় করা হয়েছে। এ যেন ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া। আমরা জানি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে 'বালিশকাণ্ড' বিষয়টি। সরকারি প্রকল্পের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানো, কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতি, বারবার পরিকল্পনা পরিবর্তন ইত্যাদি আমাদের দেশে অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে পরিকল্পনা-ত্রুটিজনিত কারণে ক্রয়কৃত মালপত্রও অনেক ক্ষেত্রে হয় পরিত্যক্ত। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের মূল ঠিকাদারদের সঙ্গে উপঠিকাদারদের জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে। এক কথায় বলা যায়, এ প্রকল্প ঘিরে ইতোমধ্যে যা কিছু হয়েছে, প্রায় সবই প্রশ্নবিদ্ধ। এর মধ্যে একটি বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিজিসিবিতে জমা দেওয়া তাদের নথিপত্রে ঢাকার যে ঠিকানা উল্লেখ করেছে, তাও ভুয়া। এত বড় একটি প্রকল্পের কাজ যাদের দেওয়া হলো, তাদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যে গাফিলতি কিংবা হীনস্বার্থ কাজ করেছে, তাও প্রতীয়মান। দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারের এত বড় কর্মযজ্ঞের যে সুরতহাল সমকালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে পিজিসিবির দায়িত্বশীলদের বক্তব্য খোঁড়া যুক্তি বৈ কিছু নয়। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত প্রকল্প পরিচালক সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, ওই কর্মকর্তা তার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু আমরা মনে করি, তিনি কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম সঞ্চালন লাইন। কিন্তু সঞ্চালন লাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা যেন নিমজ্জিত হিমশৈলীর দৃশ্যমান চূড়ার মতো। আমাদের ধারণা, সারাদেশেই এমন স্বেচ্ছাচার ও অনিয়মের ঘটনা কমবেশি ঘটে চলেছে। যেখানে সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে নিষ্ঠ, সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর মাধ্যম নিয়ে যে অনাচার হয়েছে কিংবা হচ্ছে, এর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত না হলে এত অর্জন বিসর্জনের রাস্তাটাই প্রশস্ত করবে। এমনটি তো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত হতে পারে না। বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে কিংবা উৎপাদন বাড়িয়ে কী লাভ, যদি সঞ্চালন ব্যবস্থা মসৃণ করা না যায়! ত্রুটিমুক্ত সঞ্চালন লাইন একই সঙ্গে সঞ্চালন লাইনের সম্প্রসারণ ছাড়া উৎপাদন বৃদ্ধি অর্থহীন। আমরা জানি, দেশে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই এ বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো পূর্ণতা পেতে পারে। সর্বাগ্রে উপড়ে ফেলতে হবে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ। উন্নয়নের মূল প্রতিবন্ধক দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে না পারলে জনপ্রত্যাশা কিংবা জনস্বার্থ হোঁচট খেতেই থাকবে।

বিষয় : বিদ্যুৎ খাত

মন্তব্য করুন