২৭ মার্চ ভারতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে তাদের পররাষ্ট্র দপ্তরে দীর্ঘ এক তারবার্তা পাঠানো হয়। ওই দিন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব টিএন কাউল তার কার্যালয়ে তৎকালীন মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গ্যালেন এল স্টোনকে ডেকে পাঠান। কাউল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিংয়ের আগের দিন লোকসভায় দেওয়া বিবৃতির অনুলিপি স্টোনকে হস্তান্তর করে জানান, লোকসভা সদস্যরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে 'খুব নরম সুরে' বিবৃতি দেওয়ার জন্য সমালোচনা করেন। উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লোকসভায় বলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি ভারত সরকারের সহানুভূতি রয়েছে। সেখানে তাদের দমন করা হচ্ছে এবং ভারত সরকার এ বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে, সেখানে হতাহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে দাঁড়িয়েছে।

কাউল জানান, ভারত তাদের নিজস্ব সীমানা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ পাকিস্তানের পরিস্থিতি ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে ভারতে একটি অস্বাভাবিক বড় সংখ্যক শরণার্থীর আগমন হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। তবে ভারত সরকার এ জাতীয় উদ্বাস্তুদের রক্ষণাবেক্ষণ ও খাদ্য জোগানোর জন্য প্রস্তুত। তবুও তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এ কারণে যে, ঘটনার দীর্ঘসূত্রতা সমস্যা মোকাবিলা করায় তাদের সক্ষমতাকে যথেষ্ট পরিমাণ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে কিছু শরণার্থীর আগমন ঘটেছে বলে কাউল জানান। তিনি বলেন, এবার সমস্যাটি বেশ আলাদা মাত্রা পেয়েছে এবং তারা ওষুধ, কম্বল, খাবার এবং আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুমান করছেন। এ জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। কাউল আশা প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তানের ঘটনায় বাইরের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ হবে না এবং এ জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কামনা করেন।

কাউল জানান, পূর্ব পাকিস্তান ইস্যুতে চীনা হস্তক্ষেপের একটি গুজব রয়েছে। এ ব্যাপারে কিছু প্রমাণ রয়েছে। যেমন- কাশ্মীর, তিব্বত এবং বার্মা হয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে কিছু বিমান উড়ে যেতে চীন পাকিস্তানকে অনুমতি দিয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বলেন, পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের সঙ্গে চীনের একটি বোঝাপড়া রয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে মুজিব তাদের ওপর একহাত নিয়েছেন বলে চীন ঘোলা জলে মাছ শিকারের চেষ্টা করতে পারে।

মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গ্যালেন এল স্টোন কাউলকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থান হচ্ছে, পাকিস্তান সমস্যার বিষয়টি একটি অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, যা অভ্যন্তরীণভাবেই নিষ্পত্তি করা উচিত। এর পর পাকিস্তান সমুদ্রপথে এবং সিলন (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) হয়ে বিমানপথে যে প্রচুর সংখ্যক অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্য-সামন্ত পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এনেছিল, তার একটি চিত্র কাউল তুলে ধরেন। পূর্ব পাকিস্তানে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গতিবিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে কিনা- স্টোন সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে কাউল বলেন, সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের সময় পশ্চিমবঙ্গকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করা হয়েছিল। সেখানকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে না।

ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তার শেষের দিকে গ্যালেন এল স্টোন তার নিজের মন্তব্য প্রকাশ করে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, পূর্ব পাকিস্তান বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে যুক্তিসংগত পরিপূর্ণ এবং খোলামেলা আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কার্যকরী হবে। তিনি আশা করেন, পূর্ব পাকিস্তান শরণার্থীদের পক্ষে মানবিক ত্রাণ সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের কতটা প্রস্তুত থাকতে হবে, তার একটি ইঙ্গিত পররাষ্ট্র দপ্তর তাকে দিতে পারে।

'ফরেন রিলেশন্স অব দি ইউনাইটেড স্টেটস, ১৯৬৯-১৯৭৬' শীর্ষক যুক্তরাষ্ট্রের দলিল থেকে সংকলিত।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ