উন্নয়নের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে জনকল্যাণ। কিন্তু প্রায়ই উন্নয়নের সুফল কাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথে নানারূপ প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও এ প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে। কারণ, সমাজ-সচেতনতার অভাবে সাধারণ স্বার্থকে ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে মানুষ জলাঞ্জলি দেয়। এমন দেখা যায়, উন্নয়নের স্বার্থে সড়ক বর্ধিত করে দেওয়া হলে সেই বর্ধিত অংশে ক্ষুদ্র-ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসে যান, নয়তো পরিবহন কোম্পানিগুলো তাদের গাড়ি পার্ক করে জায়গা দখল করে রাখে। এলাকায় কোনো স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলে প্রভাবশালীরা অযোগ্য লোকদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য ঘুষ-বাণিজ্য শুরু করে।

ঢাকার লালমাটিয়ার বি ব্লক এবং এ ব্লকের মাঝে একটা মাঠ আছে। পাঁচ বছর আগেও মাঠের চারদিকে দেয়ালের ভেতরে একটা ওয়াকওয়ে ভালো অবস্থায় ছিল। হঠাৎ একদিন সড়ক ভেঙে খানিকটা জায়গায় ময়লা সংগ্রহের স্থাপনা বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হলো। কিন্তু স্থানীয় দাবির মুখে সেই স্থাপনা নির্মাণ না হলেও সেই হাঁটার রাস্তাটি আর আগের অবস্থায় ফিরল না। মাঠের চারদিকে বহু ভবন তৈরি হলো, কিন্তু ভেঙে ফেলা ১০০ গজ রাস্তা আর জোড়া লাগল না! যেহেতু রাস্তাটি ব্যবহারযোগ্য নয়, তাই এর জায়গায় দোকান বসে গেল, চটপটি বিক্রয়ের ভাসমান গাড়ি স্থায়ী রূপ নিল। দোকানের উচ্ছিষ্টে দূষিত পরিবেশ ভর করল সেখানে। এখন ভদ্রভাবে ওই পথ দিয়ে চলাফেরা করা দুস্কর।

বেশ কিছুদিন আগে মাঠের ভেতরে নিচু অংশে এবড়ো-খেবড়ো অবস্থায় মাটি ফেলা হয়েছিল। সেই মাটির ওপরে ঘাস গজিয়ে গেছে। এখন তা সমান করা প্রায় অসম্ভব। মাটি ফেলা হয়েছিল খেলার মাঠ হিসেবে বা গণজমায়েতের জায়গা হিসেবে ব্যবহারের জন্য। তাই যদি হয়, তাহলে সমান না করে কিসের উন্নয়ন করা হলো? মানুষ কি লাফিয়ে লাফিয়ে হেঁটে মাঠ ব্যবহার করবে? নাকি জনগণ হেঁটে হেঁটে মাটি সমান করে দেবে? এমন উদ্ভাবনী চিন্তার জন্য উন্নয়নের ব্যবস্থাপকদের ধন্যবাদ না জানিয়ে পারা যায় না!

উন্নয়নের লক্ষ্য যদি হয় মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা, তাহলে জীবনযাত্রা চালু রেখেই উন্নয়ন করতে হবে। জনসাধারণের কোনো সুবিধা যদি বন্ধ করতেই হয়, তা খুব স্বল্প সময়ের জন্য করা উচিত। উন্নয়ন করছি- এই কথা বলে, দুঃদিন আগে বানানো সড়ক আজ ভাঙলাম। উন্নয়নের মালসামানা দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রাখলাম। সড়কের পাশে সবার ব্যবহারের জায়গায় শ্রমিকদের আবাসনের জন্য ছাপরা বানিয়ে আবাসিক এলাকার মধ্যে অস্থায়ী শেড ওঠালাম।

তিন মাসের কাজ এক বছর ধরে করার জন্য ভিত্তিপ্রস্তর বসালাম। এমন করার কথা কোনো উন্নত অর্থনীতির দেশে চিন্তা করা যায় না। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে যাদের জন্য কাজ তারা তো জীবদ্দশায় উন্নত পরিবেশ দেখে যেতে পারবেই না, বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যদি তাদের আত্মত্যাগ দাবি করে দুর্ভোগ হজম করতে বলা হয়, তাহলেও সেটা বড় বড় দু-একটা ব্যতিক্রমী উন্নয়ন প্রকল্পের বেলায় হতে পারে। কিন্তু ছোট একটা উন্নয়ন কাজের সময় অহেতুক টেনে টেনে লম্বা করার সংস্কৃতি কবে দূর হবে তা কেউ জানে না।

এই উন্নয়ন গরু-খাসির চর্বির মতো। গোশত ব্যবসায়ীরা লোহার বাঁকা আংটার সঙ্গে গোশতের পাশে চর্বি ঝুলিয়ে রাখে। খদ্দেররা যতই বলুক না কেন, চর্বি দেবেন না, কসাইরা ঠিকই খানিকটা চর্বি কেটে ঢুকিয়ে দেবে। এই চর্বি অস্বাস্থ্যকর। তবু বাড়িতে আনলে ফেলতে পারে না কেউ! মাপের জিনিস, টাকা দিয়ে কিনে এনেছে, ফেলতে গেলে কলিজা লাগে- কার এত বড় কলিজা আছে? সাধারণ জনগণ উন্নয়নের শরিকদের কাছ থেকে এমন চর্বি নিতে বাধ্য হচ্ছে দিনের পর দিন।