একাত্তর সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনটি অন্যরকমভাবে পালিত হয়েছিল। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ও মুর্তজা বশীরকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। ১০ দিন ধরে কয়েকশ ছবি ও পোস্টার এঁকে চিত্রশিল্পীরা ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শহীদ মিনার থেকে বিপ্লবী চিত্রের বিশাল এক অভিনব মিছিল বের করলেন। প্রত্যেক শিল্পীর হাতে সেদিন ছিল একটি করে আঁকা চিত্র। আর এসব চিত্রের বিষয় হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের তথা বাঙালিদের বঞ্চনা, নির্যাতন, সম্পদ লুট, ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি আক্রমণ ও অবহেলার ছবি।

সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে হাজারো মানুষ বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানাতে যায়। তবে বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দেন, তিনি জন্মদিন পালন করেন না। বাসভবনে পৌঁছানোর পর দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধু তাদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনায় মিলিত হন। জনৈক বিদেশি সাংবাদিক জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে জানতে চান জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় কামনা কী? জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'জনগণের সার্বিক মুক্তি'। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি জন্মদিন পালন করি না। আমার জন্মদিনে মোমবাতি জ্বালাই না, কেকও কাটি না।' বঙ্গবন্ধু বলেন, 'আমি জনগণেরই একজন। আমার জন্মদিন কি, আর মৃত্যুদিনও কি? আমার জনগণের জন্যই আমার জীবন ও মৃত্যু।'

এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দ্বিতীয় দফা আলোচনা করেন। এদিন আলোচনা মাত্র এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। বঙ্গবন্ধু কালো পতাকা শোভিত সাদা গাড়িতে চড়ে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রবেশ করেন এবং ১১টা ৬ মিনিটে বের হয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু গাড়ি থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, 'দেখুন আমার বলার কিছুই নাই। আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আমরা আবার আলোচনায় মিলিত হবো। পরবর্তী দফা আলোচনা কখন অনুষ্ঠিত হবে, তার সময় এখনও নির্ধারণ হয় নাই।' তিনি আরও বলেন, 'আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে এবং এ লক্ষ্যে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে।'

এর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে ধানমন্ডির বাসভবনে ফিরে দলীয় হাইকমান্ডের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হন। তিনি দলীয় হাইকমান্ডকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার আলোচনা সম্পর্কে অবহিত করেন এবং সেই আলোকে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন।

এদিকে, এদিন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আসা সাবেক কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী মি. কর্নেলিয়াস ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মেজর জেনারেল ওমর প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্টের চিফ স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল পীরজাদার সঙ্গে এক আলোচনায় মিলিত হন।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান আব্দুল ওয়ালী খান ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক ঘণ্টা স্থায়ী আলাপ-আলোচনা শেষে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনের জন্য জাতীয় পরিষদই সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত স্থান। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের চার দফা দাবি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ন্যাপপ্রধান বলেন, 'এ ব্যাপারে পূর্বেই আমি আমার অভিমত ব্যক্ত করেছি।'

ন্যাপ সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এক বিবৃতিতে ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসের পরিবর্তে 'স্বাধীন পূর্ববাংলা দিবস' পালনের জন্য দলীয় কর্মী ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, যেখান থেকে আর পিছু হটা সম্ভব নয়। সুতরাং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উচিত হবে বঙ্গবন্ধুর দাবিসমূহ মেনে নেওয়া। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ 'প্রতিরোধ দিবস' পালনের আহ্বান জানায়। এদিন 'খ' জোনের সামরিক আইন প্রশাসক ২ মার্চ থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় যে পরিস্থিতিতে সামরিক কর্তৃপক্ষকে সাহায্যের জন্য সেনাবাহিনী তলব করা হয়, তার কারণ অনুসন্ধানের জন্য পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের আদেশ জারি করেন। ঘোষণায় আরও বলা হয়, প্রধান বিচারপতি তদন্ত কমিশনের প্রধানকে মনোনয়ন দান করবেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী, সিভিল সার্ভিস, পুলিশ সার্ভিস এবং ইপিআর থেকে সদস্য নিয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠিত হবে।