১৯৪১ সালের ঘটনা। ফরিদপুরে নিখিল মুসলিম ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্স হবে। শিক্ষাবিদ ইব্রাহিম খাঁ, কবি নজরুল ইসলাম ও হুমায়ুন কবির আসবেন। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকর্তা ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কোথাও সভার অনুমতি না পেয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো হুমায়ুন কবিরের বাড়ি আলীপুরের কবির ভিলায়। নানা বাধার মধ্যে সম্মেলন শেষ হলেও কমিটি হয়নি। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪২ সালে ফরিদপুর এসে সেই দলাদলি শেষ করে এবং সবাই মিলে একসঙ্গে আন্দোলনের জন্য মুসলিম লীগের যুবকর্মী হিসেবে বিভিন্ন জেলায় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করতে ছোটাছুটি করেন। ১৯৪৫ সালে ভারত সরকার জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা করে। এ সময় মুসলিম লীগের কলকাতা অফিস থেকে যুবকর্মীদের ওপর নির্দেশ দেওয়া হলো, তোমাদের প্রতি এলাকায় নির্বাচনের অফিস নিয়ে কর্মী শিবির গড়ে তুলতে হবে। শেখ মুজিবকে ফরিদপুর জেলার দায়িত্ব দেওয়া হলো। তিনি গোপালগঞ্জ থেকে তার দলসহ চলে এলেন ফরিদপুরে। সঙ্গে নিয়ে এলেন সাইকেল। ক্যানভাস করার জন্য মাইক্রোফোন হর্ন, লিফলেট ও অন্যান্য জিনিস। ফরিদপুরে এসে কর্মী শিবির গঠন করতে জেলা মুসলিম লীগের সহযোগিতা পেলেন না। তারা শহরে সবাইকে বলে দিলেন, কেউ বাসা ভাড়া দেবেন না। অবশেষে তিনি বাধ্য হয়ে শহরের বাইরে (সম্প্রতি এলাকাটি পৌরসভার অন্তর্গত) চর কমলাপুরে তার এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের দোতলা বাড়িটি ভাড়া নিলেন। সুসজ্জিত বাগানবাড়ি। গয়না নৌকা ভাড়া করে গোপালগঞ্জ থেকে চাল-ডাল নিয়ে দলবলসহ চর কমলাপুর ঘাটে নামতেন। মাসাধিককাল তিনি হর্ন মাইক, লিফলেট নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের নির্বাচনের ক্যানভাস করেছেন। এ সময় সর্বদাই তার সঙ্গে থাকতেন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের দু'জন ছাত্র জালাল উদ্দিন ও হামিদ। তারা রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক হোস্টেলে অবস্থান করতেন। এ হোস্টেলে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সময় এসেছেন।

১৯৫০ সালের শেষদিকে শেখ মুজিবুর রহমানকে তিন মাসের সাজা দেওয়া হয়। এ সময়ে অন্য একটি মামলায় গোপালগঞ্জ কোর্টে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে পুলিশ পাহারায় তাকে ফরিদপুর কারাগারে আনা হয় সন্ধ্যায়। যেহেতু কারাগার কর্তৃপক্ষ রাতে কোনো হাজতি বা আসামি গ্রহণ করে না, তাই তাকে পুলিশ পাহারায় ফরিদপুর পুলিশ লাইনে আনা হয়। এখানে তাকে পুলিশ ক্লাবের একটা রুমে রাখা হয়। পুলিশ লাইনে ঢুকতেই ডানদিকে পুলিশ ক্যান্টিন। এটিই সেদিনের পুলিশ ক্লাব ছিল। সকালে সিপাইরা তার চা-নাশতার ব্যবস্থা করেন। তারপর তাকে জেল গেটে নিয়ে এলেন। ওপরের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে জেল হাসপাতালের নিচতলার একটা রুম খালি করে সেখানে রাখা হলো। পৌরসভার দোতলা বা সামনের রাস্তা থেকে হাসপাতালটি স্পষ্ট দেখা যেত। এ হাসপাতালের নিচতলায় জননেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে একাকী থাকতে হয়েছে।

১৯৫১ সালের শেষদিকের ঘটনা। ফরিদপুর জেল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা জেলে পাঠানো হলো। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সে সময়ে বাংলা ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল। হাসপাতালে বসেই নেতা শেখ মুজিব সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি করার আহ্বান জানালেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস পালন করতে বললেন। তিনি আরও জানালেন, বাংলা ভাষার দাবি পূরণ ও মুক্তির জন্য তিনি এবং মুসলিম লীগ নেতা মহিউদ্দিন আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে জেলে অনশন করবেন। এ খবর জানাজানি হলে সরকার আবার তাকে ঢাকা জেল থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত করল। ১৭ তারিখে ফরিদপুর জেলে এসেই তিনি বাংলা ভাষার দাবি ও মুক্তির জন্য অনশন শুরু করলেন। তাকে আবার জেল হাসপাতালে নেওয়া হলো। সঙ্গে মহিউদ্দিনও অনশন শুরু করেন।

তখন শেখ মুজিবুর রহমান শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েন। জেল কর্তৃপক্ষ তাকে জোর করে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে। বাধা দেওয়ায় তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নাকের ভেতর নল ঢুকিয়ে নলের মাথায় কাপের মাধ্যমে তরল ঢেলে খাবার দেওয়া হয়। নাকে ঘা হয়ে যায়। শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন ও জেল থেকে শোনা ফরিদপুরের ভাষা আন্দোলনেরও বর্ণনা দিয়েছেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে তার মুক্তির আদেশ আসে জেল কর্তৃপক্ষের হাতে। তিনি ও মহিউদ্দিন অনশন ভঙ্গ করেন। পরদিন তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান লোকজনসহ তাকে নিতে ফরিদপুর জেলগেটে আসেন। স্ট্রেচারে করে হাসপাতাল থেকে জেলগেটে আনা হয়। এর পর আলীপুরের আলাউদ্দিন খানের বাড়িতে। সেখানে সেবা-শুশ্রূষা ও বিশ্রামের পর তাকে তার বোনের বাড়িতে নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহণ করলে এসব স্মৃতিময় স্থান স্মরণীয় করে রাখতে পারে।

সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত, অধ্যাপক ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ