এ বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী তথা মুজিববর্ষের উদযাপন এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুভক্ষণ আমাদের জন্য বিশেষ উপলক্ষ হয়ে এসেছে। বস্তুত স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর এই জন্মদিনে বাংলাদেশ এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যা আমরা বলতে পারি তার স্বপ্নের সোনার বাংলার অনেক কাছে। বাংলাদেশের আজকের অর্থনীতি, উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং বিশেষ কিছু অর্জন বিশ্বে কেবল আমাদের সমীহ-জাগানিয়া অবস্থানই তৈরি করেনি; একই সঙ্গে অনেকেরই ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মনে করি, বিশ্বে যেখানেই বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়, সেখানেই উঠে আসে বঙ্গবন্ধুর নাম। বস্তুত শতবর্ষ আগে অখণ্ড বাংলার প্রত্যন্ত পল্লিতে জন্মগ্রহণ করে ধাপে ধাপে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-দূরদর্শিতা-বিচক্ষণতার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, তখন থেকেই তিনি বিশ্বের বিস্ময়। শুধু উপমহাদেশে নয়, বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে তার অবস্থান ছিল দৃঢ়। বাংলাদেশের বাইরেও এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার অপর নাম ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, আজকের সমৃদ্ধির বাংলাদেশ সেই শক্তিশালী ভিতেরই বহিঃপ্রকাশ। আমরা দেখেছি, গত মাসের শেষ সপ্তাহে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে উন্নয়নশীল দেশের কাতারভুক্ত হয় বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে তথাকথিত 'তলাবিহীন ঝুড়ির' তকমা ঘুচিয়ে বাংলাদেশের জন্য এই অর্জন ঐতিহাসিক ও গর্বের বলে আমরা মনে করি। আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্ব পরিমণ্ডলে মর্যাদা ও সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। তখন আয়তনে ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের বড় পক্ষ হয়ে উঠেছিল। এমনকি জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ, ন্যাম প্রভৃতি বিশ্ব সংস্থায় বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা বাংলাদেশের ললাটে যে অমোচনীয় কলঙ্ক লেপ্টে দিয়েছিল, এর ফলে আমরা কেবল বঙ্গবন্ধুকেই হারাইনি; উপরন্তু বাংলাদেশও এক ভিন্ন পথে পরিচালিত হয়। সব দিক থেকেই পশ্চাতে যাত্রা করে দেশ। ওই অনুশোচনা থেকে যদিও আমাদের সহজে মুক্তি নেই, তারপরও স্বস্তির বিষয় হলো, বাংলাদেশ পুনরায় সব দিক থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সেই গতি পেয়েছে। বস্তুত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অনির্বাণ বাতিঘর। তিনি ধ্রুবতারার মতো আমাদের শক্তি ও সাহসের উৎস হয়েই থাকবেন।

আমরা দেখছি, ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু কেবল ক্রমেই উজ্জ্বলতর হচ্ছেন না; তার রাষ্ট্রচিন্তা, তার দর্শন, তার মানবিকতা, তার রাজনীতিও ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। পঁচাত্তরের পর ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে গণতন্ত্র, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির সুমহান আদর্শ মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা চলেছিল, কালের পরিক্রমায় তা সর্বাংশে ব্যর্থ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি দৃশ্যমান অর্জন সম্ভব হয়েছে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে প্রত্যয় ব্যক্ত করতেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ তারই সার্থক রূপায়ণ। আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধুকন্যা বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশ সফলভাবেই মোকাবিলা করেছেন। পাঁচ দশকে আমাদের দারিদ্র্যের হার কমা, গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমাসহ বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। আজ জাতীয় শিশু দিবসও।

আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু ছিলেন শিশু অন্তপ্রাণ। আমরা চাই, আমাদের শিশুদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া হোক। শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম, পরোপকার ও মহানুভতা জাগ্রত করতে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দরকার। আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু কোনো নির্দিষ্ট দলের নন; তিনি বাংলাদেশেরই অপর নাম। তার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে আমরা তারই প্রদর্শিত পথে চলে তারই স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করব। বঙ্গবন্ধুর চিরন্তন আদর্শের পথ ধরে বাংলাদেশ অগ্রগতির চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাবেই। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে তার প্রতি সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।