৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে সিনাইয়ের সেন্ট ক্যাথারিন মনাস্ট্রি থেকে একটি প্রতিনিধি দল হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যে কোনো ধরনের আক্রমণ থেকে তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তিনি তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে তাদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য একটি অঙ্গীকারপত্র বা আহদনামা প্রদান করেন। এই অঙ্গীকারপত্রটি অদ্যাবধি সিনাই পর্বতের পাদদেশে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন খ্রিষ্টান মঠ- সেন্ট ক্যাথরিন মনাস্ট্রিতে দুষ্প্রাপ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর সঙ্গে সংরক্ষিত আছে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নির্দেশে হজরত আলী (রা.) স্বহস্তে এটি লেখেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র হাতের ছাপে সিলমোহর করা অঙ্গীকারনামাটি পরিস্কারভাবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সম্পদ রক্ষার অধিকার, যার যার ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। এখানে অঙ্গীকারনামাটির বাংলা অনুবাদ পত্রস্থ করা হলো- 'এটি মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহর কাছ থেকে একটি বার্তা। নিকটে ও দূরে যারা খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন, তাদের জন্য এই অঙ্গীকার যে, আমরা তাদেরই একজন। নিশ্চয়ই আমি, ভৃত্য, সাহায্যকারী এবং আমার অনুগামীরা তাদের রক্ষা করব, কেননা খ্রিষ্টানরা আমার নাগরিক এবং আল্লাহর নামে বলছি, যা কিছু তাদের অসন্তুষ্ট করবে আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখব। তাদের প্রতি কোনো ধরনের জোর-জবরদস্তি করা যাবে না। তাদের কোনো বিচারককে চাকরি থেকে অপসারণ করা যাবে না, কোনো সন্ন্যাসীকে তার মঠ থেকে সরানো যাবে না। শুধু তাদের ধর্মের কারণে তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না অথবা সেখান থেকে কোনো জিনিস কোনো মুসলমানের ঘরে নেওয়া যাবে না। যদি কেউ কোনো কিছু নেয়, সে যেন আল্লাহর চুক্তির বরখেলাপ করল এবং তার রসুলকে অমান্য করল। নিশ্চয়ই তারা আমার মিত্র এবং তারা যা ঘৃণা করে তার বিরুদ্ধে আমার নিশ্চিত চুক্তি রইল। কেউ তাদের কোথাও যেতে বা যুদ্ধে যোগদান করতে বাধ্য করবে না। মুসলমানরা তাদের জন্য লড়াই করবে। কোনো খ্রিষ্টান নারীর সম্মতি ছাড়া কোনো মুসলমান পুরুষ তাকে বিয়ে করতে পারবে না। প্রার্থনার জন্য গির্জায় যাওয়া থেকে তাকে বাধা দেওয়া যাবে না। তাদের গির্জার সম্মান রক্ষা করতে হবে। এটি মেরামত করতে কিংবা চুক্তির পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখা থেকে তাদের বাধা দেওয়া যাবে না। এই জাতির (মুসলিম) কেউ কেয়ামত পর্যন্ত এই চুক্তির অবাধ্য হবে না।'

ষষ্ঠ শতকে নির্মিত সেইন্ট ক্যাথরিন মঠটি ভ্যাটিকানের পর দ্বিতীয় প্রাচীন মঠ এবং ১৪০০ বছর ধরে খ্রিষ্টীয় ইতিহাসের এই মূল্যবান সংগ্রহশালাটি মুসলিম শাসনাধীনে সযত্নে সংরক্ষিত হয়ে এসেছে। মঠের সন্ন্যাসীদের মতে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই মঠে এসেছিলেন এবং মঠের পাদ্রিদের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন আলোচনাও করতেন। সনদটির সত্যায়িত কয়েকটি প্রতিলিপি সেইন্ট ক্যাথারিন মঠের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। সন্ন্যাসীরা জানান, অটোমান-মামলুক যুদ্ধে (১৫১৬-১৭) মিসর বিজয়ের সময় মূল দলিলটি সংরক্ষণের জন্য অটোমান সেনারা এখান থেকে নিয়ে ইস্তাম্বুলে সুলতান প্রথম সেলিমের কাছে পৌঁছে দেয়। তারপর এর একটি প্রতিলিপি সেইন্ট ক্যাথারিন মঠের সন্ন্যাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এই অঙ্গীকারপত্রটি প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করেন অ্যান্টন এফ হাদ্দাদ (১৮৬১-১৯২৪) এবং ১৯০২ সালে এটি নিউইয়র্কে প্রকাশিত হয়। ১৯১৬ সালে ঐতিহাসিক নায়ুম শাকুর তার 'তারিখ সিনা আল কাদিম' গ্রন্থে আহদনামাটির আরবি ভাষ্য ছাপার অক্ষরে প্রথম প্রকাশ করেন।

খলিফা আল-মুইজ (৯৫৩-৯৭৪), আল-আজিজ (৯৭৫-৯৯৬), আল-হাকিম (৯৯৬-১০২১), আল-জহির (১০২৪), আল-হাফিজ (১১৩৪) এবং অটোমান সুলতানরা নবী (সা.)-এর অঙ্গীকারপত্রটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া ১০ থেকে ২০ শতক পর্যন্ত বিভিন্ন ফরমান, ফতোয়ায় এই আহদনামার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। হানাফি, শাফি, মালিকি, হানবালি এবং ইসমাইলি তরিকার বিশেষজ্ঞরাও এর সত্যতা প্রতিপাদন করেছেন। ১৫১৭ সালে সুলতান প্রথম সেলিমও একই কথা বলেছেন।

সনদটির ইংরেজি অনুবাদক যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক ডক্টর মুক্তেদার খান ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় তার মতামতসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে তিনি বলেন- এই সনদের প্রথম ও শেষ বাক্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা প্রতিশ্রুতিটি অনন্তকালব্যাপী ও বিশ্বজনীন রূপ ধারণ করেছে।

আহদনামাটির ২৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ৯ জন উল্লেখযোগ্য মুসলিম সাক্ষী ছিলেন আবু বকর আল-সিদ্দিক (রা.); উমর ইবন আল-খাত্তাব (রা.); উসমান ইবন আফ্‌ফান (রা.); আলি ইবন আবু তালিব (রা.); আবু আল-দারদা (রা.); আবু হুরায়রা (রা.); আবু আল ফাজল ইবন আব্বাস (রা.) এবং তালহা ইবন উবায়েদউল্লাহ (রা.)।

ডক্টর মুক্তেদার বলেছেন, যারা মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি করতে চান, তারা সেইসব বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করেন যা বিভক্তি ও বিবাদ সৃষ্টি করে। কিন্তু যখন খ্রিষ্টানদের প্রতি হজরত মুহাম্মদের (সা.) এর প্রতিশ্রুতির মতো তথ্যের নাম উচ্চারিত হয় এবং এর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, তখন এটি মৈত্রীর সেতুবন্ধ রচনা করে। এটি মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার ঊর্ধ্বে উঠতে এবং খ্রিষ্টানদের উদ্বুদ্ধ করে সম্প্রীতির কারণ হতে, যারা ইসলাম কিংবা মুসলমানদের সম্পর্কে তাদের মনে ভীতি লালন করে। হজরত মুহাম্মদের (সা.) এর অঙ্গীকারপত্রটি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

২০১৮ সালে পাকিস্তানে আসিয়া বিবি ব্লাসফেমি মামলার সর্বশেষ রায়ে এই অঙ্গীকারনামার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়। বলা হয়, এটি একটি 'চুক্তিপত্র বা অঙ্গীকারনামা, যা মুহাম্মদ (সা.) খ্রিষ্টানদের সঙ্গে করেছিলেন, তা আজও বলবৎ।'

লেখক ও অনুবাদক