ভুখানাঙ্গা মানুষের জন্য এক স্বাধীন দেশের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভূত হলেন টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া এক যুবক শেখ মুজিবুর রহমান। সংগঠিত করলেন এ দেশের মানুষকে। বারবার জেল খাটলেন, নির্যাতনের শিকার হলেন, তবু মাথা নোয়ালেন না। অবশেষে তারই নেতৃত্বে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিল এক স্বাধীন দেশ- বাংলাদেশ। এ দেশের কৃষি ও কৃষকের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন বঙ্গবন্ধু। অহর্নিশ এ দেশের কৃষকের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা ছিল তার বড় ভাবনা। কৃষকরাও তাকে ভালোবেসেছেন অকৃত্রিমভাবে। এ দেশের মানুষের মনে তিনি এক অক্ষয় মানব। বঙ্গবন্ধু মিশে আছেন এ দেশের জল, হাওয়া আর মৃত্তিকার সঙ্গে। মিশে আছেন এ দেশের বিস্তীর্ণ মাঠে-প্রান্তরে আর ফসলের ক্ষেতে। কৃষক আর কিষানির হাসিমাখা মুখ যেন বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবি। আমাদের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে মিশে থাকা এক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমাদের গল্পগাথায়, শিল্পে-সাহিত্যে তাই অনিবার্যভাবে আঁকা হয়েছে তাকে নিয়ে কত রকম চিত্র। এবার শস্যচিত্রে অন্য এক অভিধায় অঙ্কিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। বাংলার শস্য ক্ষেত্রের বিশাল ক্যানভাসে নতুন এক মাত্রায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবি। আমাদের প্রধান ফসল ধানের দুই বর্ণের জাতের চারা মাঠে এক শৈল্পিক রূপে রুয়ে দিয়ে আঁকা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সে জীবন্ত মুখচ্ছবি। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেধা ও মননের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে এ শিল্পকর্ম। সে যেন এক ভিন্ন মাত্রার শিল্পকর্ম। যাকে কিনা বলা যায় স্থাপনা শিল্প। এ দেশে এ রকম ব্যতিক্রমী বিশালাকৃতির শিল্পকর্ম এটিই প্রথম। কৃষকের শ্রম-ঘাম আর মমতার সঙ্গে শিল্পপিপাসু মানুষকে নিয়ে এ কাজটির নেপথ্যে রয়েছে কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি।

বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের বালেন্দা গ্রামের ১০৫ বিঘা জমির ওপর প্রকৃতি আর মানুষের মেলবন্ধনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে ইতিহাসের বৃহত্তম বঙ্গবন্ধুর সে মুখচ্ছবি। কথা বলছিলেন এই নিয়ে 'শস্যচিত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদ'-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং আহ্বায়ক কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিশাল শস্যচিত্র হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশাবাদ ছিল তার কণ্ঠে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞের শুরু হয় বাস্তবে বেশ আগে থেকেই। জায়গা নির্ধারণ, সেখানকার বিশাল চত্বরে ১০৫ বিঘা জমির ওপর ১২ লাখ ৯২ হাজার বর্গফুট আয়তনব্যাপী শস্যচিত্রে ইতোমধ্যে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবি। শস্যচিত্রটির দৈর্ঘ্য ৪০০ মিটার আর এর প্রস্থ ৩০০ মিটার। নকশা মোতাবেক চারা লাগানো হয়েছে সেখানে যথাসময়ে। দুই বর্ণের চারা বড় হতে হতে বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবিটি ফুটিয়ে তুলেছে। বাংলার উর্বরা মাটি থেকে বেড়ে ওঠা ধানগাছের বর্ণিল আভায় ভেসে উঠেছে বাঙালির প্রাণ পুরুষ জাতির পিতার মুখচ্ছবি। জাতির পিতার প্রতি তার জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধা জানানোর এটি হবে এক অভিনব শিল্পকর্ম।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখার এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে এগিয়ে এসেছে বেসরকারি সংস্থা 'ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার'। পুরো চিত্রকর্মের লেআউট বা নকশাটি সম্পন্ন করেছেন কয়েকজন কৃষি প্রকৌশলী। নকশা অনুযায়ী চারা রোপণের জন্য আড়াই ফুট দৈর্ঘ্যের খুঁটি যথাস্থানে স্থাপনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবির বিভিন্ন অংশ ফুটিয়ে তোলার প্রাথমিক কাজটি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) একশ সদস্য। শস্যচিত্রের ধানগাছের পরিচর্যায় রয়েছেন সেখানকার ১৫০ জন কিষান-কিষানি। তাদের সবার শ্রমে-ঘামে আর মমতায় ধানের চারা বেড়ে উঠেছে নির্দিষ্ট মাত্রায় আর তাতে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর বর্ণময় মুখচ্ছবিটি।

বালেন্দা গ্রামের বিস্তীর্ণ জমি লিজ নেওয়া হয়েছে সেখানকার কৃষকের কাছ থেকে। সমতল এই বিস্তীর্ণ জমি হলো শস্যচিত্রের প্রাথমিক ক্যানভাস। দুই বর্ণের হাইব্রিড ধান জাতের চারা এই শিল্পকর্মের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ধানের বেগুনি বর্ণের এফ-১ হাহব্রিড ধানের চারা আনা হয়েছে চীন থেকে। আর সবুজ বর্ণের হাইব্রিড জাতের ধান জাত 'জনকরাজ' সরবরাহ করেছে 'ন্যাশনাল এগ্রি কেয়ার'। পরিকল্পনা ও নকশামাফিক সেসব দুই বর্ণের চারা রোপণ করা হয়েছে জানুয়ারির ২৯ তারিখ। অতঃপর কৃষকের সস্নেহ পরিচর্যায় বেড়ে উঠেছে সবুজ আর বেগুনি বর্ণের ধানগাছ। ধান শস্য পাকতে শুরু করেছে বলে বঙ্গবন্ধুর গোঁফ, চোখ, মাথা হয়ে উঠেছে খয়েরি বর্ণের আর মুখচ্ছবির অন্য অংশ হয়ে উঠেছে সোনালি বর্ণের। দুই বর্ণের মিশেলে ধানগাছকে অবলম্বন করে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর বিশালাকৃতির মুখচ্ছবি। সে বাস্তবেই এক অনন্য শিল্পকর্ম। অভিনব, নান্দনিক ও প্রাকৃতিক।

এখন সর্বত্র চলছে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীর নানা কর্মসূচি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর এক মাহেন্দ্রক্ষণে শস্যচিত্রে বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি বিশালতর এক ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নেয়। দুই বর্ণের ধানের চারার শৈল্পিক বিন্যাস আর এদের কাঙ্ক্ষিত বৃদ্ধি ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে তুলেছে শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবি। ১৬ মার্চ ছিল সেই শুভক্ষণ- গিনেস ওয়ার্ল্ড কর্তৃপক্ষ মেইল করে তা নিশ্চিত করে।

সভাপতি, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, ঢাকা