ভারতের কৃষক আন্দোলন নিয়ে বহির্বিশ্বের সমালোচনাকারীদের এক হাত নিয়েছেন ক্রিকেট আইকন শচীন টেন্ডুলকার। বলেছেন, এটা ভারতের 'অভ্যন্তরীণ' বিষয়। অথচ কিশোর বয়সেই শচীন বিশ্ব অবাক ব্যাট চালিয়ে প্রতিভার ঝলকে চমকে দিয়েছিল। ক্রিকেট মাঠ থেকে যেদিন তিনি বিদায় নিলেন, কী অনবদ্য বিদায়গাথায় হৃদয় ভিজিয়ে দিলে, ক্রীড়াবিশ্ব তাকে শুভাশিসে ভরিয়ে দিল। আহা! এমন হয় না। এত বিশাল ক্রিকেট নক্ষত্র, অথচ কী অসাধারণ পরিমিত। মাঠে, ঘরে, বাইরে।

ক্রিকেট ভুবনের আরেক নক্ষত্র ব্রায়ান লারা, জীবনাচরণে শিথিলতায় দাগ তার। অথচ শচীন নিষ্পাপ সুশীলতার এক আইকন। কত যে অর্জন তার। তবু এতটুকু দাম্ভিকতার নেই ছাপ। এক অসাধারণ রুচিময় পরিবারের বিশ্ব প্রতিনিধি। শেষমেশ সেই রুচিঝলমল পটভূমি কুচি কুচি করে দিলেন। কেন শচীন, কেন? কেন? খুব আঘাত পেয়েছি শচীন! তার নয়নমনোহর কাভার ড্রাইভ, একের পর এক সেঞ্চুরি, রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙা যে জাদুকরী ক্রিকেট অর্জন, তা তিনি যেন নিমেষে এক বিবৃতিতেই বিকৃত করে দিলেন! ভালোবাসার কোটি কোটি মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিমেষে ঘৃণার পাত্রে পরিণত করে দিলেন! এমনটা কোনোদিন কোনোভাবেই ভাবতেই পারিনি।

অবশ্য এমন আঘাত পেয়েছিলাম গভীর অনুরক্ত ছিলাম যার, আমাদের যৌবনকে হিরণ্ময় উপাদানে পুষ্ট করেছিলেন যে ভূপেন হাজারিকা, পৃথিবীর সব মানুষকে, পদ্মা মেঘনা যমুনাকে এক করে দেওয়ার উদাত্ত আহ্বানের সেই শিল্পী যখন বিভাজনের উগ্র নৃশংসতার জমায়েতে যোগ দিলেন জীবনের শেষভাগে, সে আঘাতও কম লাগেনি। 'ফাঁসির মঞ্চ থেকে'খ্যাত জুলিয়াস ফুচিকের বইটি হাতে দিয়ে পড়তে বলেছিলেন যে রাজনৈতিক বড় ভাই, তাকেই একদিন দেখলাম ফাঁসিদাতা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীদের উত্তরাধিকারের সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিতে। গভীর আঁধারের প্রতিনিধি। অথচ আলোকিত অগ্রণী দাবিদার।

ফিরে আসি ক্রিকেটেই। কাব্যিক মোচড়ে ব্যাটিংকে শিল্পোত্তীর্ণ করার ভারত ক্যাপ্টেন আজহার ওসব কেলেঙ্কারি না করলেই কি হতো না! আর ক্রিকেট-ভালোবাসার মহান উৎস খেলোয়াড় দক্ষিণ আফ্রিকার হ্যান্সি ক্রনিয়ের অধঃপতন মেনে নিতে পারিনি আজও। কী ট্র্যাজিক পরিণতি অমন অসাধারণ ক্যাপ্টেনের। ভারতের অভিনয় জগতের সুউচ্চ প্রতিভা নাসিরউদ্দিন শাহ। এক সময় নানাবিধ পুরস্কারে ধন্য ব্যক্তিটি বাণিজ্যিক ঢলে প্রবাহিত হয়ে বলেই ফেললেন, ওসব পুরস্কারের কাগজ ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি, ওসব সনদ ফনদ চাই না, চাই শুধু নগদ নারায়ণ। অনুপম খেরের মতো বড় মাপের অভিনেতা আজ সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের উদ্‌গিরণ-ইঞ্জিন।

যে বাংলাদেশ থেকে ভারতের এসব উদাহরণ লিখছি, সেখানেও এমনি অজস্র সুনীতি-বিসর্জনের নির্লজ্জ অধ্যায় দেখেছি। যাদের আত্মত্যাগ-পরিশ্রম-নিবেদন দেখে মুগ্ধ অনুসারী হয়েছি, এক জীবনের মূল সময়ে সম্ভাব্য ক্যারিয়ারকে হেলায় লুটিয়ে দিয়েছি, সেসব মহান ব্যক্তিবর্গকে যখন দেখি জীবনের পড়ন্ত বেলায় ব্যক্তি-মহিমা বিকিরণে অধীর-অস্থির হয়ে যেতে। সাফল্যের মাপকাঠি বদলে দিতে। নিবেদিত পরিস্থিতির বদলে অন্য প্রকার মাখন খেতে পাগল হয়ে যেতে।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একটি গানের প্রথম চরণ : রং বদলায় রং বদলায়। তা শচীনের জীবনের অভিজ্ঞতায় রং তো বদলাবেই। তবে একেবারে নীতি গুবলেট করে? এসব কথা লিখতে খুব কষ্ট পাচ্ছি। শচীনের দীর্ঘকালের একান্ত অনুরক্ত আমি, মনে হতো পৃথিবীর সব ভালোবাসা ঢেলে দিই। পাতানো লেখার লোভের ফাঁদে পা দেননি তিনি। ভোগবাদী বেলেল্লা জীবনধারাকে প্রত্যাখ্যান করে চলেছেন এতটাকাল। সেই তিনিও?

ভারতীয় উপমহাদেশে আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত। তারপর ক্ষমতার বিভাজনের খেলায় কে দোষী, কে দায়ী সেসব জটিল প্রশ্ন এড়িয়ে বলতে চাই, গোটা উপমহাদেশের সব দেশেই বড়-ছোট-মাঝারি পুঁজিওয়ালাদের কৌশলে এবং পুঁজিহীনদের মেহনতে চলছে জীবনগাড়ি। ভারতে পাঞ্জাবকে বলা হয় শস্যভান্ডার। সেখানকার গমে তৈরি পাউরুটি ভদ্রলোকদের ভাষায় ব্রেড। সেই ব্রেড নিশ্চয়ই সকালবেলায় শচীনের ব্রেকফাস্ট মেন্যুতেও আছে। তা তিনি ভাত খান, রুটি খান, নান খান, তাতে পাঞ্জাবি কৃষকদের পুঁজি ও মেহনত তার মতো অনেকের ব্যক্তিগত জীবনেও জড়িয়ে আছে। সেই শস্যপণ্য নিয়ে ভারতে এক বড় বিবাদ ঘটে গেছে। হঠাৎ 'সংখ্যাগরিষ্ঠতার' মসলা দিয়ে ভারতীয় শাসকবর্গ এমন বিল-তরকারি সংসদের একবেলাতেই বানিয়ে বলল, হে কৃষক এ তরকারিই তোমাদের একমাত্র খাদ্য। কারও সঙ্গে মতবিনিময় না করে এমন বিতর্কিত শস্যপণ্য-আইন জারি করতে চাইল যাতে গোটা পাঞ্জাবের কৃষকসমাজ বিগড়ে গেল। পৃথিবী এমন বিস্ময়কর কৃষকবিদ্রোহ কখনও দেখেনি।

বড় ধনী-মাঝারি ধনী-মেহনতি কৃষক একজোটে এমন কঠিন পণ শান্তিপূর্ণ বিদ্রোহ ঘটাল যাতে চমকে গেল পৃথিবী। এমন কঠিন শীতে মহাসড়কের পাশে অবস্থান নিয়ে দিল্লির উপকণ্ঠে দুই শতাধিক কৃষক প্রাণ দিল, তবু বিদ্রোহীরা এতটুকু টলে গেল না। শাসকরা কত যে কৌশল করল, তবু কাজ হলো না আজও। এমন সময় বিশ্ব ক্রিকেটের আদর সন্তান শচীন একবারও তার অন্নদাতাদের পাশে এতটুকু সান্ত্বনা দিতে গেলেন না, যাবেন না, ভাবতেও পারিনি। পৃথিবীতে সব আন্দোলন-সংগ্রামেই বাইরের সংহতি-সহায়তা থাকে।

আমাদের বাংলাদেশ ভারত-সোভিয়েতের মিলিত সমর্থনে পৃথিবীতে নবমানচিত্র হিসেবে সৃজিত হয়েছে। গণচীনের বিপ্লব সহায়তা পেয়েছে সোভিয়েতের। আর ভিয়েতনাম? চীন সোভিয়েত তো আছেই গোটা পৃথিবীর নৈতিক সমর্থন পেয়েছে। দুই শতাধিক কৃষকের প্রাণ কেড়ে নেওয়া বিদ্রোহে এই ক্ষুদ্র আমিসহ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের সমর্থন রয়েছে। মিয়ানমারের সর্বপ্রকারের গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক। তা ভারতের কৃষক বিদ্রোহে পৃথিবীর কিছু সেলিব্রিটির একাত্মতা প্রকাশে শচীনসহ ভারতের কিছু সেলিব্রিটি হঠাৎ 'সার্বভৌমত্ব' লঙ্ঘনের গর্জন তুললে কেন?

অবশ্য প্রথমে তেমন বুঝিনি। পরে বুঝলাম 'আ-আ' ভয়াল বিশাল পুঁজি-ফ্যাক্টর। সংসদে হঠাৎ শস্যপণ্য বিল পাস করানো হয়েছে ওই 'আ-আ' গোষ্ঠীর জন্যই ... এটাই কৃষক বিদ্রোহীদের মূল অভিযোগ। খাদ্যব্যবসাটা চাই 'আ-আ'দের। কৃষক উৎপাদন করবে, নেপোয় মারবে দৈ। 'আ-আ' খাবে লাভের আসল মাখন। শচীনকে ক্রিকেট ভুবনে ভোগবাদী কোনো বিচ্যুতিতে পিছলে পড়তে দেখিনি। শেষ পর্যন্ত ওই 'আ-আ' আকর্ষণে পিছলে গেলেন? 'আ-আ' মানে 'আম্বানি-আদানি' করপোরেট জুটি। যা বর্তমান ভারত সরকারের মূল খুঁটি। ওদের ইঙ্গিতে হেলে যান মহাবীর মোদিজি।

কিন্তু শচীন, তিনিও হেলে গেলেন?

প্রকৌশলী; রম্য লেখক