কভিডকালীন স্ব্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে সারাবিশ্বে 'কন্টাক্টলেস পেমেন্ট' বা ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে ঝুঁকতে শুরু করে মানুষ। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এ সময়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মোবাইল আর্থিক সেবার ওপর নির্ভরতা বাড়তে শুরু করে। গ্রাহকদের প্রয়োজন পূরণে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন নতুন সেবা সংযোজন অব্যাহত রেখেছে।

দ্রুত প্রসারিত মোবাইল আর্থিক সেবা খাতে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা প্রতিপালনের দায়বদ্ধতার প্রেক্ষাপটে 'এমএফএস রেগুলেশন-২০১৮' প্রবর্তন করে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সার্কুলার-২০ এর মাধ্যমে সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি করেছে।

সব নতুন এমএফএস অ্যাকাউন্ট খোলা বা গ্রাহক নিবন্ধনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কেওয়াইসি (নো ইওর কাস্টমার) ফরম যথাযথভাবে পূরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশনের জন্য বিএফআইইউ সার্কুলার-২৫ জারি করে ই-কেওয়াইসি পূরণের প্রতিটি ধাপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এমএফএস অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কাস্টমার-ডিউ-ডিলিজেন্স বা সিডিডি প্রতিপালন বাধ্যতামূলক। যে ব্যক্তির নামে অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এমএফএস সেবা প্রদানকারী সংস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ খাতের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোর কোনোই সুযোগ নেই।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অসাধারণ অবদান রাখা বাংলাদেশের এমএফএস সেবা বিশ্বের বুকে উদাহরণস্বরূপ। মোবাইল ব্যাংকিং প্রসারে ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক 'অ্যালায়েন্স ফর ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন' পলিসি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। গত ১০ বছরে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার কারণেই কোটি মানুষের আর্থিক লেনদেনের আস্থার জায়গাটি অর্জন করতে পেরেছে বিকাশের মতো এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। বহুসংখ্যক গ্রাহক যেহেতু এমএফএস ব্যবহার করেন ও উত্তরোত্তর করবেন, সে কারণে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বা লাইসেন্সবিহীন সব এমএফএস প্রতিষ্ঠানেরই নিয়মশৃঙ্খলা-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে যেসব ঝুঁকি রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা জরুরি। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, যে ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, তিনিই অ্যাকাউন্ট খুলছেন। তিনি যে তথ্য দিচ্ছেন তা নির্ভুল ও সম্পূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন- এমন বিষয়গুলো সিডিডির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। এমএফএস অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বিএফআইইউ সার্কুলার-২০ অনুযায়ী সিডিডি নিশ্চিত না করে রেজিস্ট্রেশনকৃত অ্যাকাউন্ট অবৈধ বলে গণ্য। ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র-এনআইডির উভয় পাশের ছবি এবং অ্যাকাউন্ট আবেদনকারীর তাৎক্ষণিক উপস্থিতিতে তোলা নিজ ছবির সঙ্গে এনআইডি ডাটাবেজের ছবির ফেসিয়াল ম্যাচিং বাধ্যতামূলক। বিএফআইইউ সার্কুলার-২০ ও সার্কুলার-২৫ ব্যাখ্যায়িত পদ্ধতির বাইরে যে কোনো শর্টকাট পদ্ধতিতে খোলা এমএফএস অ্যাকাউন্ট বৈধ বিবেচনার সুযোগ নেই। কারণ গ্রাহক নিবন্ধনে বিএফআইইউ প্রদত্ত দুই প্রক্রিয়াতেই এনআইডির মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য যাচাই করা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব। এই নিয়ম প্রতিপালিত না হলে অসাধু চক্র ভুয়া পরিচয় কিংবা জালিয়াতি করা তথ্যের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, ঘুষ লেনদেন, মাদকের লেনদেন, চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির কোনো এমএফএস প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি এনআইডির বিপরীতে মাত্র একটি অ্যাকাউন্টই চালু থাকতে পারে। বিএফআইইউ সার্কুলার-২৫ অনুযায়ী প্রযুক্তির ভিত্তিতে নির্মিত ই-কেওয়াইসি পদ্ধতি যদি না মেনে চলা হয় তাহলে একজন গ্রাহকের একটি এমএফএস প্ল্যাটফর্মে একাধিক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ থাকে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত নির্দেশনার সরাসরি ব্যত্যয়।

তৃতীয়ত, নতুন গ্রাহক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তালিকাভুক্ত কিংবা অন্যান্য দেশি-বিদেশি কালো তালিকায় থাকা কেউ এমএফএস অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। এ ছাড়া দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণকারী ও গ্রহীতা উভয়কেই কালো তালিকার বিপরীতে স্ট্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। শুধু তাই নয়; বিএফআইইউ নীতিমালা অনুযায়ী এমএফএস প্রতিষ্ঠানের সব গ্রাহককেই নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক স্ট্ক্রিনিং করার নির্দেশনা দেওয়া আছে। এই স্ট্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার ফলে এমএফএস প্রতিষ্ঠান মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন- উভয় ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে পারে।

চতুর্থত, এমএফএস ইকোসিস্টেমে চ্যানেল পার্টনার অর্থাৎ এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর ও মার্চেন্টরা আসলে এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং গ্রাহকদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। এ কারণে, যে কোনো ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন বিশেষ করে 'ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) ট্রানজেকশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লেনদেন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মাঠ পর্যায়ে নিরীক্ষণ পরিচালনা করা প্রয়োজন, যাতে চ্যানেল পার্টনারদের কর্মকাণ্ড নজরে রাখা যায়।

পঞ্চমত, নতুন সেবা আনা এবং বর্তমান সেবাগুলোকে আরও উন্নত করতে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তা করতে গিয়ে কোনোভাবেই ঝুঁকি নির্ণয় বা কমপ্লায়েন্সের জায়গায় ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএফআইইউ নীতিমালার মধ্যে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কোনো নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করতে পারবে না। রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট বা ঝুঁকি-মূল্যায়ন নিশ্চিত করার পরেই বিএফআইইউর পর্যালোচনা সাপেক্ষে এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নতুন সেবাটি বাজারে আনতে পারে। এর বাইরে স্বঘোষিত নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাজারে চালু করা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দেওয়া নীতির বিরুদ্ধাচরণ হবে। ষষ্ঠত, ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রাহকের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা দিতে নিয়মিত অডিট এবং স্ব-মূল্যায়ন করা এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব। তবে আর্থিক খাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এড়াতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে এমএফএস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অডিটের ফলাফল মূল্যায়ন ও নিরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ ও তদারকি অত্যন্ত জরুরি।

এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের অর্থ নিয়ে কাজ করে, তাই তাদের প্রথাগত অ্যাকাউন্ট নিবন্ধনসহ সব কার্যক্রম সব সময় ঝুঁকিমুক্ত রাখতে সচেষ্ট থাকা অত্যাবশ্যক। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, এমএফএস খাতে নীতি-বহির্ভূত কোনো পদক্ষেপের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে তা হবে আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং তাদের আর্থ-সামাজিকভাবে বিপর্যয়ের অনুঘটক। সে কারণে সব এমএফএস প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন নীতিমালা মেনে চলা ও প্রতিপালন ব্যবস্থা বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই।

(পূর্ণ ভাষ্য পড়ূন, সমকাল অনলাইনে)

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল; চিফ এক্সটারনাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার; প্রধান, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ প্রতিপালন কর্মকর্তা, বিকাশ