নকল পণ্যের কারখানা যেভাবে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সোমবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি; প্রসাধনী, ওষুধ, পানীয় এমনকি খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত অনেক ধরনের নকল পণ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। নকলের তালিকায় প্রতিনিয়ত কেবল নিত্যনতুন পণ্যই যুক্ত হচ্ছে না; একই সঙ্গে কারখানা ছড়িয়ে পড়ছে জেলা পর্যায়েও। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অভিযানেও কাজ হচ্ছে না বরং অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল পণ্য উৎপাদনের জায়গা বদল করছে। আমরা মনে করি, নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত ঠেকানো না গেলে তাতে অর্থনীতি আরও ক্ষতির মুখে পড়বে এবং তার চেয়ে বড় বিষয়, এটি জনস্বার্থে হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বলাবাহুল্য, সমকাল তার দায়িত্বশীলতা থেকে নকল পণ্যবিরোধী প্রচারাভিযান চালু করেছে 'নকল পণ্য কিনবো না, নকল পণ্য বেচবো না'। আমরা মনে করি, নকল পণ্যের কেনাবেচা রোধ করতে হলে এর উৎপাদন বন্ধে সর্বাগ্রে দৃষ্টি দিতে হবে।

আমরা জানি, নকল বা ভেজাল রোধে সরকারি প্রতিষ্ঠানও কম নয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যেমন কাজ করছে, তেমনি র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নকল পণ্য ও খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে নানা অভিযান পরিচালনা করছে। বস্তুত এসব প্রতিষ্ঠানের অভিযানের কারণেই নানা ধরনের নতুন নকল পণ্য ধরা পড়ছে। এমনকি ভোক্তারাও আজ সচেতন হচ্ছেন। তারা নকল পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ড নকল বন্ধে পদক্ষেপ নিতে আবেদন করছে। তারপরও নকল পণ্যের উৎপাদন কিংবা বাজার কমছে না কেন? আমরা মনে করি, অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফার জন্য যেভাবে কৌশলে নকল পণ্য তৈরি করছে; সরকারের সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের চেয়েও অধিক তৎপর হলে এর মূলোৎপাটন অসম্ভব নয়। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের কারণে নকল পণ্য বিক্রিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন অনলাইন মাধ্যম বেছে নিচ্ছে। এটা স্পষ্ট যে, বাজার পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার হওয়ার কারণে অসাধুরা অনলাইনে সুযোগ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে খোদ অনলাইন বাজার নিয়েও অভিযোগের অন্ত নেই।

অনেক ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা ওয়েবসাইট খুলে একটি পণ্যের প্রদর্শনী করে অন্য পণ্য দেওয়াসহ নানাভাবে গ্রাহককে ঠকিয়ে থাকে। আমরা চাই, অনলাইনে কেনা পণ্যের ব্যাপারে গ্রাহক সহজেই যাতে অনলাইনে তার অভিযোগ দাখিলসহ সহজ সমাধান পেতে পারেন, সে জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আরও তৎপর হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কোনো পণ্যে বিএসটিআইর মানচিহ্ন ও বার কোড আছে কিনা, পণ্যটি মেয়াদ উত্তীর্ণ কিনা কিংবা পণ্যের গায়ে লেখা কোম্পানির লোগো ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি যাচাই করে কেনার ক্ষেত্রেও ভোক্তার সচেতনতা জরুরি। পণ্য নকলের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যে ভেজাল আমাদের অন্যতম সমস্যা। খাদ্যপণ্য নকল করার প্রবণতা রোধে নিয়মিত অভিযান কিংবা মনিটরিং জোরদার করার কথা প্রশাসনের তরফ থেকে বলা হলেও বাজারে এর প্রভাব সামান্যই পড়ছে। তা ছাড়া এসবই বলা চলে ঢাকাকেন্দ্রিক।

অথচ সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, নকল পণ্যের কারখানা দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তাই অভিযান ও মনিটরিংও দেশের সর্বত্র জোরদার করা প্রয়োজন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতেও ভোক্তারা নাকাল। চাল, ডাল, পেঁয়াজ, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বাজারে পণ্যের জোগান ও পর্যবেক্ষণে ঘাটতি স্পষ্ট। একদিকে নকল পণ্য, ভেজাল খাদ্য; অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সব মিলিয়ে ভোক্তাবান্ধব বাজার আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে সরকারের সব সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমের বিকল্প নেই। সামনে পবিত্র রমজান এবং এর পর ঈদ উপলক্ষে ভোগ্যপণ্যসহ পোশাক ও ভোগ্যপণ্যের বাড়তি চাহিদার সুযোগে পণ্যের দাম ও মানের দিক থেকে ভোক্তা যেন প্রতারিত না হন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা মনে করি, প্রশাসন তৎপর হলে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া নকল কারখানা খুঁজে বের করা কঠিন হবে না। নকল কারখানা বন্ধ করে এসব কারখানা পরিচালনাকারীদের ধরে আইনের আওতায় আনলে নকল পণ্য উৎপাদন বন্ধ করা সহজ হবে।