বছর ঘুরে বারবার ফিরে আসে অগ্নিঝরা মার্চ মাস। এবার এসেছে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে; আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি আর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। দেশভাগের পর বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গঠনের। বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি, তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে কারাপ্রকোষ্ঠে থাকতে হয় জীবনের ১২টি বছর।
যতদিন পৃথিবীর বুকে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন আমাদের রক্তকণিকায় মিশে থাকবে 'বাঙালির মার্চ' মাস; পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর ২৩ বছরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাত কোটি বাঙালির গর্জে ওঠার মাস; স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে সারাবিশ্বে বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের মাস। আজকের এই দিনে স্মরণ করি চার জাতীয় নেতাসহ তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দকে; ৩০ লাখ শহীদ আর পাকিস্তানি পৈশাচিক বাহিনীর পাশবিক অত্যাচারের শিকার দুই লাখ মা-বোন ও সব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।
১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম দিন থেকেই প্রতিটি দিন ছিল উত্তাল। মূলত ১৩ ফেব্রুয়ারি, ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের বৈঠকের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ইয়াহিয়া-ভুট্টো ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। বিভিন্ন বাহানায় ইয়াহিয়া ১ মার্চে জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত করেন। এর প্রতিবাদে সারাবাংলা গর্জে উঠল। ঢাকার রাজপথে তখন জনতার ঢল। ২-৩ মার্চ হরতাল, অন্যদিকে কারফিউর ঘোষণায় আরও ফুঁসে উঠল আপামর ছাত্র-জনতা। ইয়াহিয়া ১০ মার্চ সম্মেলন ডাকলেন। বঙ্গবন্ধু সম্মেলনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলেন। অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে সারাবাংলা তখন অচল। এর মধ্যে ইয়াহিয়া ৬ মার্চ আবার বেতার ঘোষণায় ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের বৈঠক ডাকলেন। বস্তুত এসবই ছিল ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ষড়যন্ত্রের অংশ।
এর পর এলো ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। রেসকোর্স ময়দান মানবসাগরে পরিণত হলো। উপস্থিত হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বজ্রকণ্ঠে ভেসে এলো ২৩ বছরের ইতিহাস, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান। ঘোষণা করলেন- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ল বঙ্গবন্ধুর ডাক। শুরু হলো স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি।

মার্চ মাসের প্রতিটি মুহূর্তই যেন ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়। এভাবে দিন যতই এগোচ্ছিল, পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের জাল ততই বিস্তৃত হচ্ছিল। অসহযোগ আন্দোলনও তখন তুঙ্গে। আবার ইয়াহিয়া-বঙ্গবন্ধু বৈঠক হলো। বৈঠকপরবর্তী ইয়াহিয়ার উপদেষ্টার সঙ্গে চলল আওয়ামী লীগের আলোচক দলের বৈঠক। ২৩ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাচ্ছিল। চট্টগ্রামে 'এমভি সোয়াত' থেকে অস্ত্র খালাস বন্ধে লাখ লাখ জনতা চট্টগ্রাম বন্দরের আশপাশ অবরোধ করে রেখেছিল। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুরসহ অন্যান্য স্থানে পাকিস্তানি সৈন্যরা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবশেষে ২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করলেন। এরপর 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে ২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর শুরু হলো রক্তের হোলিখেলা; নির্মম গণহত্যা। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তারের আগে স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা প্রেরণ করলেন। পরদিন ২৬ মার্চ প্রথম চট্টগ্রামে বেতার থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
অশ্রুসজল দু'চোখে ভাসছে আমার '৭১-এর সেই দিনগুলি। বাবা গোলাম আকবর চৌধুরী ছিলেন মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের অবৈতনিক সদস্য, মা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। দু'জনই জাতির পিতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দেখেছি ২৫ মার্চের কালরাত্রি। আকাশটা কিছুক্ষণ পরপর দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছিল। প্রচণ্ড গুলির শব্দ; ঢাকা শহর জ্বলছে। ভারতে যাওয়ার পথে হাজার হাজার শরণার্থীর কাফেলায় কর্দমাক্ত, কণ্টকাকীর্ণ পথে চলেছি দিনের পর দিন। ভারতের কাছাকাছি একটা নদী পার হওয়ার সময় দেখেছিলাম শুধু লাশ আর লাশ ভাসছে। এক সময় ভারতে পৌঁছলাম।
৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয়েছিল চূড়ান্ত বিজয়। আজ আমরা পালন করছি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। শুধু আত্মপরিচয়ের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, একটি অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লালিত স্বপ্নকে স্থায়ী রূপদানে পৃথিবীর বুকে এত রক্ত-ত্যাগ কোনো জাতিকে স্বীকার করতে হয়েছিল কিনা জানি না।
বাংলার মানুষের চরম আত্মত্যাগে অর্জিত এই সোনার বাংলা আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেষ হাসিনার সফল নেতৃত্বে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে। কিন্তু এখনও আমাদের মধ্যে অনেক ভেদাভেদ আছে। এখনও বাংলার মাটিতে রাজাকার-আলবদরের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে চলেছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। আর সময়ক্ষেপণ না করে সমন্বিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের সব পথ রুদ্ধ করা এখনই প্রয়োজন। যে আদর্শের ওপর ভিত্তি করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, সেই আদর্শের পতাকাতলে বাংলার ১৬ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ও সবাইকে এক কাতারে শামিল করার মাধ্যমেই আমাদের অগ্রযাত্রা আরও বেগবান করা সম্ভব। সম্ভব আত্মকলহমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গঠনের।
রাজনৈতিক বিশ্নেষক