সেই ১৯৪৮ সালের কথা। গ্রামের জুনিয়র স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে পাস করেছি ১৯৪৭ সালে। নিজ গ্রামে কিংবা আশপাশে কোনো হাই স্কুল নেই; ভর্তি কোথায় হবো? একদিন দাদির দেওয়া কাঁথা-বালিশ, বইপত্র মাথায় নিয়ে মাদারীপুরগামী বরিশাল স্টিমার সিন্ধুতে চড়ে বসলাম। মাদারীপুর শহরে জাহাজ ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় চোঙ্গা থেকে নানা রকম প্রচার কানে ভেসে আসতে লাগল। তখনকার দিনে এ দেশে মাইক ছিল না। রাস্তায় টিনের বড় চোঙ্গা ফুঁকিয়ে সভা-সমিতির ঘোষণা দেওয়া হতো। কোন নেতা আসবেন, কোন নেতা যাবেন, কখন সভা করবেন ইত্যাদি। প্রবল স্রোতের আড়িয়াল খাঁ তখন দেদার ভাঙছে। এরই মাঝে স্টিমার নোঙর করছে। চাম্বুল কাঠের তক্তার ওপর কার্পেট বিছিয়ে জাহাজ থেকে নামার সিঁড়ি তৈরি হচ্ছে। জাহাজ থেকে প্রথম শহরে নামছি। বেশ একটি থ্রিল।

শহরের রাস্তায় হাঁটছি। বিশাল টিনের ঘরে 'বায়োস্কোপ' চলছে। কলের গান বাজছে অবিরাম। কবি নজরুলের স্বকণ্ঠের গান ভেসে আসছে- 'আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে হায়, কে গো দরদি,/ খুলে দাও রঙমহলার তিমির দুয়ার ডাকিলে যদি'। কখনও বা আব্বাসউদ্দীনের গান- ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়,/ আয়রে সাগর, আকাশ-বাতাস, দেখবি যদি আয়'। কখনও বা শুনছি, শচীন সেনগুপ্তের সিরাজ-উদ-দৌলা নাটকের চমৎকার সব সংলাপ। আমাদের পৃথিবীতে তখন কমলা রঙের অনেক রোদ; অফুরন্ত রঙিন জীবনের মধুময় হাতছানি।

সেই মাদারীপুরেই ১৯৪৯ সালের কথা। নতুন টাউনে খালার বাসায় থাকি। পড়ি ইসলামিয়া হাই স্কুলে, ক্লাস এইটে। উল্লেখ্য, এর কিছুকাল আগে বঙ্গবন্ধু এই স্কুলে ভর্তি হয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন। একদিন দেখলাম, স্থানীয় শকুনি লেকের পাড়ে রাজনৈতিক সভায় বক্তৃতা হচ্ছে। বক্তৃতা করছেন তখনকার সরকারবিরোধী আওয়ামী মুসলিম লীগের তরুণ নেতা টুনু মান্নান। লিকলিকে পাতলা চেহারার মানুষ। কিন্তু কণ্ঠের আওয়াজ অবিশ্বাস্য রকম জোরালো ও ঝাঁজালো। শব্দচয়ন এবং পরিবেশনের চাতুর্য অপূর্ব। আমাকে এই টুনু মান্নান সাহেব খুব স্নেহ করতেন। একদিন স্কুল ফিরতি পথে তার সঙ্গে দেখা। আদর করে বললেন- 'আসাদ, চল আজ সন্ধ্যায় মাদারীপুর মুসলিম স্টিমার ঘাটে। 'মুজিব ভাই' আসবেন; তাকে অভ্যর্থনা জানাব।'

তার সঙ্গে গেলাম। স্টিমার ভিড়তেই মান্নান সাহেব আমাকে নিয়ে নেতার কেবিনে ঢুকে পড়লেন। কিছুটা হালকা-পাতলা চেহারা। বেশ লম্বা। সব মিলিয়ে দেখতে চমৎকার। মনে হলো, তার কণ্ঠ এবং আচরণে কেমন জানি একটা সম্মোহনী শক্তি আছে! টুনু মান্নান আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন- এ হলো আসাদুজ্জামান, বেশ কবিতা লেখে; বক্তৃতা দেয়। স্থানীয় ইসলামিয়া হাই স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। ফরিদপুর জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান খানসাহেব আলীম উদ্দীন আহম্মদ ওর খালু। হাত এগিয়ে দিলেন। হাতে হাত মেলালাম। এভাবে আমি বঙ্গবন্ধুর স্নেহ ও আশীর্বাদ লাভের বিরল সৌভাগ্য লাভ করি। পরেও টুনু মান্নান বেশ কয়েকবার আমাকে নিয়ে পুরান বাজার স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করে আনার জন্য সঙ্গে নিয়েছেন।

পরবর্তী সময়ের ঘটনা খুব সম্ভবত ১৯৫০ সালের। মাদারীপুর শহরের পুরান বাজারের রাস্তা। এই রাস্তাটি শহর ছড়িয়ে আড়িয়াল খাঁর তীর ঘেঁষে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র চরমুগুরিয়া বন্দরের দিকে চলে গেছে। এই বন্দরটি তখন পাট ব্যবসায়ের জন্য পূর্ব বাংলার ৩ নম্বর বন্দর হিসেবে খ্যাত। দেখি 'মুজিব ভাই' রিকশায় চলছেন, পাশে টুনু মান্নান বসা। মাঝারি বয়সের দু'জন লোক রিকশার পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে আর কাকুতি-মিনতি করছে- 'স্যার স্যার, আমাদের বাঁচান। আপনি কোথায় যাচ্ছেন; একটু দয়া করে বলে যান।' বঙ্গবন্ধু কড়া ভাষায় ধমক দিলেন তাকে অনুসরণ না করার জন্য। তারপরও দু'জন পেছনে পেছনে ছুটছে আর মিনতি করছে- 'স্যার, আপনার গন্তব্য স্থান না জানালে আমাদের চাকরি থাকবে না, স্যার।' বঙ্গবন্ধু মুহূর্তের মধ্যে রিকশা থামালেন। বললেন- 'চাকরি হারালে খাবি কী? যা, তোদের কর্তাকে গিয়ে বল, শেখ মুজিবুর রহমান চরমুগুরিয়ায় যাচ্ছে।' বলাবাহুল্য, এরা ছিল পুলিশের লোক; মানে আইবি। তাদের ওপর দায়িত্ব ছিল স্থানীয় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে জ্ঞাত করা- বঙ্গবন্ধু কোথা থেকে কোথায় যাবেন।

এ ঘটনার মাত্র দু'বছরের মাথায় এলো সেই রক্তঝরা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। মার্চেই আমাদের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা। ক্লাস এইটে পড়ার সময়েই আমাদের ইসলামিয়া হাই স্কুলের একাংশ কলেজ হয়ে যায়। অতঃপর কয়েক মাসের মধ্যেই স্থানীয় মাদারীপুর হাই স্কুলের সঙ্গে ইসলামিয়া হাই স্কুল একীভূত হয়ে নামকরণ হয়, 'দি ইউনাইটেড ইসলামিয়া মাদারীপুর হাই স্কুল'। মনোযোগ দিয়ে আসন্ন ফাইনাল পরীক্ষার পড়াশোনা করছি। হঠাৎ বারুদের বস্তায় আগুন ধরে গেল। ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। সাদা কাগজে লাল অক্ষর রঞ্জিত একগাদা পোস্টার এলো মাদারীপুরে। পতাকা হাতে মিছিলরত ছাত্রদের গুলি খেয়ে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য! সে কী মর্মস্পর্শী, আর হৃদয়বিদারক! উত্তেজিত ছাত্র-জনতা তাৎক্ষণিক স্থানীয় শকুনি লেকের পাড়ে জড়ো হয়েছে। আমিও এই প্রথম অন্তরের সব বেদনা নিংড়ে তারস্বরে বক্তব্য রাখলাম। টুনু মান্নানসহ বেশ কিছু নেতাকর্মী সেদিন গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন।

১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রদ্ধেয় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র অনুকম্পায় বাংলা বিষয়ে অনার্স ক্লাসে ভর্তি হলাম। তখন গুলিস্তানের পাশেই পল্টন ময়দানে রাজনৈতিক সভা-সমিতি অনুষ্ঠিত হতো। তখনও সেখানে আশপাশে মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড়, জঙ্গল ছিল। ১৯৫৬ সালে সাবসিডিয়ারি বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। একদিন নবাবপুর রেলক্রসিং থেকে হলে ফেরার পথে দেখলাম, পল্টনে জনসভা হচ্ছে। ঘোড়ার গাড়িতে বেশ কিছু মহিলাও বক্তৃতা শুনতে এসেছেন মনে হলো। সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বভাবজাত কণ্ঠে ঝাঁজালো বক্তৃতার এক পর্যায়ে বললেন, 'ভাইয়েরা আমার, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বীর সেনানী মাহবুব এখনও জেলে, আমি সদ্য কারামুক্ত। কিন্তু আমি জানি না, কত সময় আমার এই মুক্তাঙ্গনে নিঃশ্বাস নেওয়া!' দুই হাত তুলে বললেন, 'ভাইয়েরা আমার, আমাকে ওই লাল দালান আবার দু'হাত তুলে ডাকছে।' বলাবাহুল্য, জনগণের মধ্য থেকে সমস্ব্বরে চরম ধিক্কার ধ্বনি শোনা গেল। তিনি আরও বললেন, জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ঘরে ফিরলাম। ছোট মেয়ে জন্মের পর আমাকে দেখেনি।' জনতার মধ্য থেকে আক্ষেপের ধ্বনি শোনা গেল।

২ মার্চ, ১৯৭৩-এ আমি তখনকার বাংলাদেশ সিনিয়র এডুকেশন সার্ভিসে পদোন্নতি পেয়ে উত্তরবঙ্গের কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বাংলার প্রধান অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেছি। এই কলেজে তখন অধ্যক্ষ ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র নাসিমউদ্দীন আহমদ। বিভাগ-পূর্বকালে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ রংপুর কারমাইকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডামাডোলে তা আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। অতঃপর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্থানীয় জনসাধারণ থেকে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পুরোনো দাবি উত্থাপিত হয়। কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং তৎকালীন মন্ত্রী মতিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত হলো। অধ্যক্ষ, ছাত্রনেতারাসহ যথাসময়ে উপস্থিত হলাম। আমাদের সঙ্গে একজন প্রাক্তন ছাত্র ছিল রাজশাহীর। তার নাম আজ আর মনে নেই। বঙ্গবন্ধু তাকে একনজর দেখেই বলে উঠলেন- 'আরে, তুই অমুক না?' অথচ কত বছর আগে মাত্র এক-আধদিনের পরিচয়! বঙ্গবন্ধু এতদিনেও তার নাম-পরিচয় এতটুকু ভোলেননি। আশ্চর্য স্মরণশক্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর!

সুদীর্ঘ শালপ্রাংশু দেহ, অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি, তুলনাহীন কণ্ঠমাধুর্য এবং অতুলনীয় সাহস, অমিততেজ প্রাণশক্তি, অসাধারণ স্মরণশক্তি; সর্বোপরি স্বদেশের মানুষের মর্যাদা ও মঙ্গলের জন্য মরণপণ সংগ্রাম দিয়ে নির্মিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ। আজ মনে হয়, বিধাতা যাকে দিয়ে পৃথিবীতে অনন্যসাধারণ ঘটনার জন্ম দেবেন, যার ফলে জগৎসভায় একটি নতুন জাতি ও একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব সম্ভব হবে, তার তো এমনি কতকগুলো অসাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকতেই হয়। বঙ্গবন্ধু একই সময় স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং রূপকারও বটে।

প্রবীণ শিক্ষাবিদ; জনপ্রশাসনে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত