রাজশাহীর কাঁটাখালীতে শুক্রবার মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন ও বেদনাহত না হয়ে পারি না। রংপুর থেকে মাইক্রোবাসে বেড়াতে যাচ্ছিলেন ১৭ জন। শনিবার সমকাল ও অন্যান্য সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- মাইক্রোবাসটি একটি ভ্যানগাড়িকে পাশ কাটাতে গিয়ে উল্টোদিক থেকে আসা বেপরোয়া গতির একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। তৎক্ষণাৎ সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণে মাইক্রোবাসে আগুন ধরে যায়। ১৭ জন মাইক্রোবাস যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে চার পরিবারেরই ১৬ জন। মুহূর্তেই কাঁটাখালীতে যে বিভীষিকার সৃষ্টি হয়, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শনিবার দৈনিকগুলোর খবরে জানা যায়, রাজশাহীর ওই দুর্ঘটনাসহ বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত দেশের সাত জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ২৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। রাজশাহীর কাঁটাখালীতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিকতার যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে, তা দেখে যে কোনো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষেই সহ্য করা কঠিন। এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে ফের এই প্রশ্নই উঠে এসেছে, সড়ক আর কত দিন মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকবে? এভাবে আর কত প্রাণ ঝরবে?

আমরা জানি, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল মহাসড়কে বাসের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দিলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। প্রায় নিত্য এর সাক্ষ্য মিলছে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হওয়ার মধ্য দিয়ে। আমরা এর আগে অনেকবার এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই প্রশ্ন রেখেছি, সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে কি কিছুই করার নেই? অতীতে আমরা দেখেছি, ঢাকার কুর্মিটোলায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির পর ঢাকাসহ সারাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দাবিতে কীভাবে সর্বস্তরের প্রতিবাদী মানুষের ঢল নেমেছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর বিধান যুক্ত করে 'সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮' সরকার পাস করে এবং তা কার্যকর হয়। কিন্তু এর সুফল কতটা মিলেছে, এ প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে বিদ্যমান বাস্তবতায়ই। ধরে নেওয়া যায়, আইনটি শুধুই যেন কাগুজে! আমরা জানি, জাতিসংঘের অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশও অঙ্গীকার করেছিল, ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে কাজ করবে। বস্তুত তা তো হয়ইনি বরং দুর্ঘটনার হার আরও বেড়েছে। এ অবস্থায় আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, সেই অঙ্গীকার পূরণে সরকারি কর্তৃপক্ষগুলো এতদিন কী করল?

বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য, আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। দুঃখজনকভাবে এ দুর্ঘটনায় উভয়টিই আমরা দেখেছি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অভিশাপ কি অমোচনযোগ্য? আমরা মনে করি, উপযুক্ত অবকাঠামোগত ব্যবস্থা, আইন মান্য করে চলতে বাধ্য করা, দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, সতর্ক ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা দুরূহ বিষয় নয়। অনেক উন্নত দেশেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে; কিন্তু এর হার যেমন আমাদের দেশের মতো এত বেশি নয়, তেমনি নয় এমন প্রতিকারহীনও। আমাদের দেশে যে হারে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে, তা জাতীয় দুর্যোগ বললেও অত্যুক্তি হয় না। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো বন্ধসহ আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলতে সরকারের উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয় বলেও আমরা মনে করি।

আমরা এও জানি, সড়ক দুর্ঘটনায় মামলার সংখ্যা অত্যন্ত কম। কারণ, অধিকাংশ সময়ই ভুক্তভোগী আদালতের দ্বারস্থ হন না। আবার আদালতে গেলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় খুব কম মামলারই। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণেও অনেকে এ প্রক্রিয়ায় যান না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের তদারকির পাশাপাশি চালক নিয়োগে মালিকদেরও সতর্কতা জরুরি। প্রশিক্ষণবিহীন কেউ যাতে গাড়ি চালনার লাইসেন্স না পান, তা নিশ্চিত করার দায় বিআরটিএর। দিনের পর দিন সড়ক মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকতে পারে না।