জনগণনায় সংখ্যা বেশি মানে কেবল পরিমাণে বেশি নয়, দাপটেও বেশি। একই সম্প্রদায়ভুক্ত জনসংখ্যার আধিক্য তাই কখনও কখনও আইন-কানুনকে পরোয়া না করার ঔদ্ধত্য তৈরি করে, যার পরিণতি সংখ্যলঘু নিপীড়ন। এই ঔদ্ধত্যের সরল পরিমাপ করা চলে- 'কটা ঘরে আগুন লাগালে পুড়িয়ে মারলে ক'হাজার, দেখি ঘরে বাইরে তাকালে জ্বলে ঘর আবার আমার'-কবীর সুমনের এই ভাষ্যে। তাই সংখ্যাগুরু দলকে সালাম-আদাব জানাতে তিনি এতটুকু সময় নেন না। বাংলাদেশেও সংখ্যাগুরুর নাখোশের কারণ না হওয়ার প্রয়াসে সংখ্যালঘুরা সর্বদা মনোযোগী। তবু সময়ে-অসময়ে তাদের ঘর পোড়ে, ভিটেয় ঘুঘু চরে; উপাসনালয় গুঁড়িয়ে যায়, এমনকি কখনও কখনও উড়ে যায় প্রাণপাখিও। এর পরও যারা সর্বদা ঢিপঢিপ বুকে টিকে থাকেন, তাদের কপালে সব অর্থেই সাঁটা থাকে ঊন-মানুষের পরিচয়। যেমন কবীর সুমনের দেশে আয়েশা আনোয়ার গ্রাহাম শমসের, বঙ্গদেশে তারা বিনোদ অঞ্জলি ভবতোষ শ্যামল।

রামু-নাসিরনগর-নোয়াখালী-শাল্লা ইত্যাদি ঘটনার উদাহরণ টানা তাই কবীর সুমনের ভাষ্যের ভিত্তিতে স্রেফ সংখ্যাতাত্ত্বিক। তাতে পোড়া ঘরবাড়ির সংখ্যা আছে, আর্থিক ক্ষতির অঙ্কটাও পাওয়া যায়, কিন্তু সংখ্যাগুরুর লাগামছুট দাপটের বিপরীতে সংখ্যালঘুর ভীতসন্ত্রস্ত প্রাণের ধুকপুকি ধরা পড়ে না, বোঝা যায় না মানুষ হয়েও নূ্যনতম মানুষের মর্যাদা না পাওয়ার মর্মবেদনা। একের পর এক তাণ্ডবের পর ধ্বংসযজ্ঞের ছবি-ভিডিও ছাপা ও সম্প্রচার হয় ভুক্তভোগী মানুষদের ভগ্ন বুকের, ত্রাসিত হৃদয়ের ছবি; কিন্তু কোথাও 'ক্যাপচার' হয় না! অথচ এই ছবিটা রাষ্ট্রের হৃদয়ে প্রতিফলিত হওয়ার কথা ছিল, হয়েছে কি?

যে নীতি-আদর্শ রাষ্ট্রের ভিত্তি, রাষ্ট্রের কাণ্ডারিদের যে দায়িত্ব পরিপালনের কথা, তাতে সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই শেষ কথা। ধর্মের পরিচয়ে নয়, রঙের ভিত্তিতে নয়, অর্থের জোরে নয়, ক্ষমতার দাপটে নয়, রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্যে নয়, অঞ্চলভেদে নয়, লেবাস দেখে নয়, সব মানুষের সব ধরনের অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিপীড়কের হাত থেকে নিপীড়িতকে রক্ষা করতে সচল থাকবে রাষ্ট্রের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। যে কারণে মাইকে ঘোষণা দিয়ে একদল উন্মত্ত মানুষ সংগঠিত হয়ে যখন আরেক দল নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ পায়, বাধাহীনভাবে বসতভিটায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে, রক্তপাত ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে ফিরে যেতে পারে, তখন রাষ্ট্রের কোনো ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্যতা পায় না। মানুষ বুঝে যায়, 'ইচ্ছাকৃত' চোখে ঠুলি, কানে মাফলার জড়িয়ে থাকা ব্যাপারটা কেমন। কিন্তু আজ যেনতেনভাবে দায় এড়ানো গেলে আগামীকালও নিদায় থাকা যাবে, ইতিহাসে এমন নজির নেই। নতুন করে নিজেদের মতো করে ইতিহাস রচনা করে গেলেও সময় ঠিকই তাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে।

সবল-দুর্বলের সরল সমীকরণে সংখ্যালঘু নিপীড়নকে ফেলার চেষ্টা বিষয়টিকে স্রেফ ধামাচাপা দেওয়ার অপকৌশল। সংখ্যাগুরু দলের মাঝে দুর্বলদের শোষিত হওয়ার উদাহরণ টানাও উটকো তর্ককে টেনে লম্বা করা। যার বল নেই, অর্থের জোর নেই, তিনি সবদিক থেকে সবলের দ্বারা নিষ্পেষিত হন বটে; কিন্তু গোষ্ঠীগতভাবে নিপীড়িত হন কেবল সংখ্যালঘুরাই সব দেশে, সব কালে।

ক্ষমতার আরাধনায় নিবিষ্ট রাজনীতি সংখ্যাগুরুর তুষ্টি অর্জনে যত মনোযোগী, ধর্মের স্পর্শকাতরায় যত সতর্ক, এর এক আনাও যদি সে আদর্শিক হতো, মানবিক হতো, পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। ভোটের সমীকরণে সমাজকে ফেলার পরিণতিই আজকের বিভক্তি, বিভাজন।

সাংবাদিক
hello.hasanimam@gmail.com

মন্তব্য করুন