জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী আয়োজিত কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রতিবেশী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নানা দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। বস্তুত একই অনুষ্ঠানমালার বিভিন্ন দিনে মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের উপস্থিতির সঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিকে একই পাল্লায় মাপার অবকাশ নেই। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবিস্মরণীয় ভূমিকা এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অবিভক্ত বাংলার অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং এই মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে প্রতিবেশী দেশটির প্রাসঙ্গিকতা উপেক্ষার অবকাশ নেই। এও স্বীকার করতে হবে, ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির মঞ্চ ভাগাভাগি কিংবা সাক্ষাৎ ও বৈঠক প্রথাগত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন নয়। কিন্তু ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নৈকট্য এবং তার জের ধরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন অমীমাংসিত ও সম্ভাবনাময় ইস্যুগুলোর বিবেচনায় দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যে কোনো সাক্ষাৎই গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা দেখেছি, প্রথম দিন রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্বিতীয় দিন দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দু'দেশের মধ্যে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও আটটি যৌথ প্রকল্প উদ্বোধন হয়েছে। গত এক দশকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বহুমাত্রিকতা তৈরি হয়েছে এবং ক্রমেই তা বিস্তৃত হচ্ছে- এ দফায় স্বাক্ষরিত ও উদ্বোধন হওয়া সমঝোতা স্মারক ও প্রকল্পগুলো তাতে নিশ্চয়ই নতুন পালক যুক্ত করবে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র কাঙ্ক্ষিত সাড়া ফেলতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলতে হবে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির কথা। এবারের বৈঠক শেষেও কেবল আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি মেলার বিষয়টি আমাদের হতাশ না করে পারে না। আমরা দেখেছি, নয়াদিল্লিতে মোদি সরকারের প্রথম মেয়াদে বহুল প্রতীক্ষিত স্থলসীমান্ত চিহ্নিতকরণ ও ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হলেও তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে জট আর খুলছে না।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ ভারতের নীতিনির্ধারকরা যদিও তিস্তা ইস্যুর সুরাহা করার প্রতিশ্রুতি বারংবার দিয়েছেন, এখন আমরা আর খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না। অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যোগ হয়েছে নাগরিকপুঞ্জি নিবন্ধন ইস্যু ও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন। পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে 'বাংলাদেশি' আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব হরণের একটি সরকারি-বেসরকারি অপচেষ্টা ক্রমেই দানা বেঁধে উঠছে। এমনকি বিজেপির রাজ্য ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও বিভিন্ন সময়ে তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর 'হুমকি' দিয়ে আসছেন। প্রথম থেকেই আমরা স্পষ্টভাবে বলে আসছি যে, বাংলাদেশকে জড়িয়ে ভারতের এমন অবস্থান অগ্রহণযোগ্য। কেবল দুই দেশের বন্ধুত্ব বিবেচনায় নয়, কূটনৈতিক সৌজন্যের স্বার্থেও। মনে রাখা জরুরি, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল যাতে স্থিতিশীল, নিরাপদ ও উন্নয়নমুখী হয়, সে জন্য শেখ হাসিনার টানা তিন মেয়াদের সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে।

এও ভুলে যাওয়া চলবে না, বাংলাদেশ বরাবরই দুই প্রতিবেশীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমরা জানি, গত দেড় দশকে ভারতের দিক থেকেও বাংলাদেশে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ উন্নয়নে দেওয়া হয়েছে বিশেষ মনোযোগ। কিন্তু ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার বন্ধুত্বের বাতাবরণ বারবার সীমান্তের কাঁটাতারে গিয়ে যেভাবে রক্তাক্ত হয়েছে, তা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। উচ্চ পর্যায় থেকে বারংবার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তরফে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। আমরা এখন অমীমাংসিত ও অস্বস্তিকর এসব ইস্যুতে ভারতের সর্বোচ্চ সদিচ্ছা দেখার অপেক্ষায় থাকব। আমরা নিশ্চয়ই চাই, বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব আরও সম্প্রসারিত হবে এবং নতুন নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্পষ্টই উদার ও আন্তরিক অবস্থান গ্রহণ করে এসেছে। ভারতের দিক থেকেও আমরা একই বার্তা প্রত্যাশা করি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত দু'দিনের সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তা আরও একবার প্রমাণ হলো।