আবহমান ভাষা, সংগীত, সাহিত্য ও অনুভূতির স্বপ্নিল ধারায় সংক্ষিপ্ত অথচ মধুর যে শব্দটি আমাদের হৃদয়ে দোলা দেয়, ভালো লাগার ভেলায় ভাসিয়ে নেয়, অন্ধকার পুরীর আঁধার রাজ্যে জ্বালায় রূপকথার আশ্চর্য প্রদীপ; সে শব্দটি হলো 'বন্ধু'। কারও কাছে বন্ধু প্রভাতের রাঙা আলো; কারও কাছে কষ্টের সময় পরম নির্ভরতা বা স্বস্তির ছায়া। আবহমান বাংলা সাহিত্যে বন্ধু শব্দটি শুধু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অনুভূতিতেই আবদ্ধ নয়, জীবন ও সাহিত্যেও বন্ধু শব্দটির রয়েছে বহুমাত্রিক রূপ। মানুষের সঙ্গে বস্তু ও প্রাণীর নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে। বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'মহেশ' গল্পে গফুরের সঙ্গে মহেশের বন্ধুত্ব 'বন্ধু' নামক অনুভূতিতে নতুনত্বের আবহ সৃষ্টি করে। শরৎচন্দ্রের 'মহেশ' গল্পে গফুর তার প্রিয় গরু মহেশের কাছে এসে ধীরে ধীরে তার গলা, মাথা, পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চুপি চুপি বলে, 'মহেশ, তুই আমার ছেলে, তুই আমাদের আট সন প্রতিপালন করে বুড়ো হয়েছিস, তোকে আমি পেট পুরে খেতে দিতে পারি নে- কিন্তু তুই ত জানিস তোকে আমি কত ভালোবাসি।' এ যেন প্রিয় কোনো বন্ধুকে ভালোবাসা!
'রামের সুমতি' শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত আর একটি গল্প। গল্পকার রামের সুমতি গল্পে রামের সঙ্গে কার্তিক ও গণেশ নামে দুটি মাছের মধ্যেও বন্ধুর মতো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। 'মিনু' বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় রচিত আর একটি গল্প। গল্পকার এ গল্পে পিতৃমাতৃহীন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছোট্ট মেয়ে মিনুর সঙ্গে শুকতারার সম্পর্ককে দেখিয়েছেন বন্ধুত্বের অনুভূতিতে, -বৈজ্ঞানিকের চোখে শুকতারা বিরাট বিশাল বাষ্পমণ্ডিত প্রকাণ্ড গ্রহ; কবির চোখে নিশাবসানের আলোকদূত; কিন্তু মিনুর চোখে সে সই। বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতিকে মানবজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বন্ধু হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার উপন্যাসে প্রকৃতি ও মানবের বন্ধুত্বের যে সেতু তৈরি করেছেন, তা অবিস্মরণীয়। সময়ের দোলাচলে মানবমনের বিক্ষুব্ধতা নিরসনের প্রধান সঙ্গী নিসর্গের কোমলতা।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার 'আরণ্যক' উপন্যাসে সত্যচরণের সঙ্গে পূর্ণিয়া জেলার অরণ্য ও অরণ্যবাসীর যে গভীর বন্ধুত্বের ছবি এঁকেছেন, বইয়ের অক্ষরে আবদ্ধ না থেকে তা হয়ে উঠেছে জীবন্ত। হুমায়ূন আহমেদ তার লেখায় জ্যোৎস্না ও বর্ষার সঙ্গে করেছেন চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব। বাংলা সাহিত্যে পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে গভীর স্বার্থহীন বন্ধনকেও বন্ধু হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এমন এক বন্ধুত্বের আখ্যান মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হাজার চুরাশির মা' উপন্যাস। ব্রতীর মা সুজাতা দেবী ছেলের বামপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরোধিতা করা দূরের কথা, ব্রতীর চিন্তাধারার সঙ্গে হয়ে যান একাত্ম। পরিবারের সবাই ব্রতীর বিরোধিতা করলেও তিনি ছেলের পাশে থাকেন পরম নির্ভরতায়; ঠিক বন্ধুর মতো। আবার কখনও ভাইবোনের বন্ধুত্বও বাংলা সাহিত্যকে করেছে জীবন্ত। প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পথের পাঁচালী' একটি বিখ্যাত উপন্যাস। এ উপন্যাসে ভাইবোনের বন্ধুত্ব বিশেষ জায়গা দখল করেছে। দুর্গার ট্রেন না দেখতে পাওয়ার কষ্ট যেমন অপুকে দোলায়, তেমনি বোনদের অব্যক্ত সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি অনেক ভাইয়ের মনে ও বাস্তব জীবনে গভীর রেখাপাত করে। শরৎচন্দ্রের 'বড়দিদি' উপন্যাসসহ বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের অজস্র গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতায় রয়েছে ভাইবোনের বন্ধুত্বের আলোকপাত।
আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের শত শত বন্ধু থাকলেও অনেককেই আমরা চিনি না বা এদের সবাই আমাদের মঙ্গল কামনা করেন কিংবা ভালো চান- এমনটা কিন্তু ভেবে নেওয়া সমীচীন নয়। এত বন্ধুর ভিড়েও আমরা কেউ কেউ তাই বন্ধুহীন। প্রতিটি সকাল-দুপুর-রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি, আপনি কিংবা আমরা সবাই কাজের ফাঁকে, মন খারাপের মুহূর্তে যাকে এবং যাদের স্মরণ করছি এবং যাদের সঙ্গে মনের কপাট খুলে কথা বলে শান্তি পাচ্ছি, তারা সবাই কি আমাদের বন্ধু! বিশ্বজগতের এই ক্রমবর্ধমান ডুবসাঁতারে 'বন্ধুত্ব' শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। তাই আসুন সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে নিই বন্ধুহীন বন্ধুর ভিড়ে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক

মন্তব্য করুন