জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনের বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অপরিসীম অবদান। বাংলাদেশের এক কোটি লোককে আশ্রয়, তাদের বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়েছে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার কথা তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ববাসীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দেওয়া যাবে না- এ দাবি হেফাজত ও অন্যান্য সংগঠন কীভাবে করল?
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্বরোচিত ও মধ্যযুগীয় অত্যাচার-নির্যাতন করেছে; গণহত্যা ও নারীদের ধর্ষণ করেছে এবং প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে দেশছাড়া করেছে। হেফাজত নেতাদের তো মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে এ রকম 'অতি বিপ্লবী' হতে দেখিনি।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ যে কেউই করতে পারে। প্রতিবাদের ভাষা ও ধরন অবশ্যই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের নেতারা তা কি করতে পেরেছেন? ২৫ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত তারা দেশে বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় যে তাণ্ডব চালিয়েছে; তা কি নেহায়েত প্রতিবাদ ছিল? এর মধ্যে কি অন্য কোনো ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যায় না?
হেফাজতে ইসলাম অন্যায় ও অপরাধমূলক শক্তি প্রয়োগ করে সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে; লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় মাস্তানি করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, গাড়ি ভাঙচুর করেছে, আগুন দিয়ে যানবাহন পুড়িয়ে দিয়েছে। হাটহাজারীতে ভূমি অফিসে হামলা করেছে। সরকারি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে; থানা আক্রমণ করেছে; রেললাইন উপড়ে ফেলেছে, রেল স্থাপনায় আগুন দিয়েছে। উদ্দেশ্যমূলক পুলিশকে আক্রমণ করে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে হেফাজতিরা আক্রমণ করেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং বসতবাড়িও তাদের হিংস্র থাবা থেকে রেহাই পায়নি।
পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন উচ্ছৃঙ্খল জনতা কর্তৃক আক্রান্ত হয় তখন তারা চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে থাকে। উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত করতে নানাভাবে চেষ্টা করে। পরিস্থিতি যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অ্যাকশনে না গেলে তাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে না, তখনই তারা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, হেফাজতের কর্মীরা হাটহাজারী থানা আক্রমণ ও ভবনের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে থানা ভবন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের ছিল। জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল। সংঘর্ষে চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৩টি জীবন হারাতে হয়েছে। বেশ কয়েকজন পুলিশ, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়; আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। আমি বিশ্বাস করি, সরকার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রাণহানির প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করবে। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার যুক্তিসংগত না হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা ফৌজদারি আইনে শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ। ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা শহর ও অন্যান্য স্থানে যে তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল; তা স্মরণ হলে এখনও শান্তিপ্রিয় নাগরিকের গা শিউরে ওঠে। তাদের সে অপরাধের বিচার হয়নি। সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অনেক মামলার তদন্তও শেষ করা যায়নি। একটির পর একটি অপরাধ করে পার পাওয়ায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের সাহস দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির কোনো সুযোগ নেই। তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।
হেফাজতে ইসলাম নিজেদের 'অরাজনৈতিক' সংগঠন দাবি করে। কিন্তু তাদের সংগঠনের নেতৃস্থানীয় পর্যায়েই রয়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা। তাদের কেউ কেউ জামায়াত-শিবির ও বিএনপির সমর্থনপুষ্ট। ২০১৩ সালের ৬ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন- বিএনপি ও জামায়াতপন্থি নেতাদের হাতে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব চলে গিয়েছিল। বিএনপি-জামায়াতের পরামর্শেই তখন সব তাণ্ডব হয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল সরকারের পতন ঘটানো। মাওলানা আহমদ শফীও বলেছিলেন, তাকে ভুল বুঝিয়ে ওই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল।
২৫ থেকে ২৮ মার্চ, ২০২১ পর্যন্ত দেশে যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তার দায়ও হেফাজত নেতাদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাদের বক্তব্য ও উস্কানিই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ধ্বংসাত্মক ও সহিংস ঘটনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফেসবুক ও ইউটিউবে হেফাজত নেতাদের উগ্র ও উত্তেজনাকর বক্তব্যের সূত্র ধরেই উস্কানিদাতাদের মামলার এজাহারভুক্ত আসামি করার আইনগত ক্ষেত্র আছে। তাদের উস্কানিমূলক বক্তব্যই সাক্ষ্য হিসেবে যথেষ্ট।
অভিভাবকরা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান কোরআন-হাদিস শেখার জন্য- তারা হাফেজ ও আলেম হয়ে বাড়িতে ফিরবে। তাদের সন্তানরা লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরবে- এ জন্য ছেলেদের মাদ্রাসায় পাঠান না। মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ, শারীরিক নির্যাতন ও বলাৎকারের অভিযোগ কোনো কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসে। ছাত্রদের ভুল বুঝিয়ে আন্দোলনের নামে সহিংস কাজে ব্যবহার করে তাদের জীবন নিয়ে খেলা করবে- এটা কোনো অভিভাবকই মেনে নেবেন না। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সোচ্চার হওয়া উচিত।
আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ লোক আলেম-ওলেমাদের শ্রদ্ধা করে, সম্মান দেখায়। কিন্তু হুজুরদের লাঠিসোটা ও ইট-পাথর হাতে নিয়ে রাস্তায় মাস্তানি করতে দেখে মানুষ স্বস্তি বোধ করে না। এতে মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়।
দেশের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সব রাজনৈতিক দলের এই মর্মে ঐকমত্য হওয়া উচিত- তারা কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হতে দেবে না। বরং তাদের জননিরাপত্তা ও জনবিরোধী কর্মের বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সোচ্চার হবেন। সাম্প্রদায়িকতা রুখে দিতে হবে। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটাই এখন সময়ের দাবি।
সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ