তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার দুর্মর কবিতায় উচ্ছ্বসিত 'আগুন-স্বপ্নে' ব্যক্ত করেছেন, 'সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/অবাক তাকিয়ে রয় :/জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়'। বাঙালির জীবনে সুকান্তের সেই অগ্নিগর্ভা কবিতার প্রথম 'সকাল-সূর্য' উদ্ভাসিত হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে '৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে। আর দ্বিতীয় বিজয় সম্ভাষিত হয়ে উঠছে একবিংশ শতকে বাঙালির শান্ত সাহস শেখ হাসিনার অসীম নেতৃত্ব প্রজ্ঞায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কল্যাণেই 'ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বাংলাদেশ' শব্দগুলো আজ জাদুঘরের পথে এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রান্তে মেহনতি মানুষের স্বপ্ন-বাস্তবতার বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বাংলাদেশ ব্যাংক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে তেমনি কিছু চিত্র সামনে এসেছে। যেখানে প্রায় ১৩টি নতুন খাতে বিশ্বের শীর্ষ দশের তালিকায় আছে বাংলাদেশ।
তবে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, প্রতি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয়, তৃতীয় বা দশমের ভেতর স্থান করে নিলেও যাদের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে তাদের প্রত্যেকের আছে স্বাধীন হওয়ার বহুদিনের ইতিহাস এবং আয়তন-সক্ষমতায় বাংলাদেশের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিমত্তা। এর পরও দেখা গেছে ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, ইলিশে প্রথম, তৈরি পোশাকে দ্বিতীয়, প্রবাসী আয়ে অষ্টম, সবজিতে তৃতীয়, আলুতে ষষ্ঠ, কাঁঠালে দ্বিতীয়, আমে অষ্টম, পেয়ারায় অষ্টম, পাট রপ্তানিতে প্রথম, উৎপাদনে দ্বিতীয়, ছাগলের দুধে দ্বিতীয়, মিঠাপানির মাছে তৃতীয়, আউটসোর্সিংয়ে দ্বিতীয় অবস্থান।
আর এসব অসাধ্য সাধন হয়েছে শেখ হাসিনার লড়াকু মানুষ এবং জনগণের অসীম মানসিকতায়। সেই মননেরই ফল শিক্ষা, স্বাস্থ্যে উন্নতি, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, দারিদ্র্য বিমোচন এবং বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইটের যুগে প্রবেশ। যদিও এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ স্বাধীনতার পরপরই দেশ বিনির্মাণ সম্পন্ন করার আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা, সামরিক শাসন, কৌশলী বৈষম্য প্রতিষ্ঠার দিকে দেশকে নিয়ে
যাওয়া হয়।
এসব হটিয়েও আজকের এই অর্জন, এটা সত্যিই বিস্ময়ের। শুধু তাই নয়, বিশ্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী আগামী ২০৩৫ সালের মাঝে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠবে। আর এখানেই চিন্তার উদ্ভব, কারণ দেশ উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুন্নত দেশ হিসেবে যে সুবিধাগুলো বিশ্বের কাছ থেকে পাওয়া যেত তা ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করবে। যেমন, বহুদেশ শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহার করে নেবে।
তাই এসবের আগেই নতুন ব্যবসায়িক জোট পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে বন্ধুত্ব এবং বাণিজ্য ঘাটতি দুই-ই সামাল দেওয়া সম্ভব। ভিন্নভাবে বললে চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী দিনের উদ্ভাবনী বা শিল্পচিন্তার বিস্তৃতি জরুরি। তাছাড়া ততদিনে রোবটিক সায়েন্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারও বাড়বে। ফলে বহু ক্ষেত্রে শারীরিক শ্রমের বিষয়গুলো অর্থহীন হয়ে আসবে। যেমন শপিং, গাড়ির ড্রাইভিং, রেস্টুরেন্ট সার্ভিসসহ বহু কিছুই হবে 'ইন্টারনেট-অনলাইনে'। ফলে বিশ্বব্যাপী প্রথাগত লোকবলের যে বাজার, সেটি ক্রমেই ছোট হয়ে আসবে।
কাজেই ওষুধ শিল্প, পর্যটন শিল্প, তৈরি পোশাক, বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি গবেষণার আয়োজন আবশ্যক এবং সেটি শক্তির নবায়ন এবং রূপান্তর পরীক্ষায়।
স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং বঙ্গবন্ধুর ১০১তম জন্মবার্ষিকী হিসেবে বাংলাদেশের অর্জন ভীষণ আনন্দের। নিজেকে বারংবার ছাড়িয়ে যাওয়ার অপার সম্ভাবনাও প্রবল। তবে এই সম্ভাবনাকে সমুন্নত করতে ক্ষমতাকেন্দ্রিক লড়াইয়ের বাইরে নিজ দেশের স্বার্থ সম্পর্কে আপসহীন থাকার মানস গুরুত্বপূর্ণ। আর এমন সম্মিলিত বোধই পথ তৈরি করতে পারবে ভবিষ্যৎ রাজত্বের, বিশ্বজয়ের বাংলাদেশের।
প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ,
কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ
haiderjitu.du@gmail.com

বিষয় : সুবর্ণ সুযোগ

মন্তব্য করুন