৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার নিয়ে বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল, যেখানে প্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূল অঞ্চলের জমির লবণাক্ততা দিন দিন বাড়ছে। শুধু লবণাক্ততাই সমস্যা নয়, এ অঞ্চলে সেচযোগ্য পানিরও অভাব রয়েছে। মূলত এই দুই সমস্যার কারণেই এই অঞ্চলে এক লাখ হেক্টরেরও বেশি জমি শুস্ক মৌসুমে অনাবাদি থাকছে।
শুস্ক মৌসুমে এই অনাবাদি জমিকে আবাদের আওতায় আনতে অস্ট্রেলিয়ার এসিআইএআর এবং বাংলাদেশের কেজিএফের অর্থায়নে ইউনিভার্সিটি অব ওয়ের্স্টান অস্ট্রেলিয়া, সিএসআইআরও, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এগ্রেরিয়ান রিসার্চ ফাউন্ডেশন একটি যৌথ প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সাল থেকে গবেষণা করে আসছে। এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং অস্ট্রেলিয়ার সিএসআইআরও যৌথভাবে গম ফসলের জাত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গত চার বছর ধরে কাজ করছে। প্রথম দুই বছরের গবেষণা থেকে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত দুটি অগ্রবর্তী লাইন বিএডব্লিউ ১১৪৭ ও বিএডব্লিউ ১২৯০-কে লবণাক্তসহিষ্ণু জেনোটাইপ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯-২০২০ মৌসুমে বিএডব্লিউ ১১৪৭ জেনোটাইপটি জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক লবণাক্তসহিষ্ণু জাত হিসেবে অবমুক্তির জন্য মূল্যায়ন করা হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই এটি অবমুক্তি পাবে। বিএডব্লিউ ১২৯০ জেনোটাইপটি ২০২১-২০২২ মৌসুমে লবণাক্তসহিষ্ণু জাত হিসেবে অবমুক্তির জন্য মূল্যায়ন করা হবে।
এই দুটি লবণাক্তসহিষ্ণু জাতের সঙ্গে অন্যান্য লবণাক্তসহিষ্ণু জাত বারি গম-২৫ ও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী ও জিঙ্কসমৃদ্ধ জাত বারি গম-৩৩সহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি জেলা পটুয়াখালী, খুলনা, সাতক্ষীরায় প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছরের মধ্যেই এই প্রকল্প কার্যকর লবণাক্তসহিষ্ণু গমের জাত বের করতে পারবে, যা উপকূল অঞ্চলে আমন ধান কাটার পর বিস্তীর্ণ পতিত জমিতে চাষাবাদ করে শুস্ক মৌসুমে কৃষকরা একটি অতিরিক্ত ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।
এছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় এ বছর গমের আরও ২০টি লাইন নিয়ে আগে উল্লিখিত তিনটি জেলায় লবণাক্ত জমিতে গবেষণার কাজ করা হয়েছে এবং গমের একই লাইন এ বছরও গবেষণার কাজ চলমান আছে। গমের এই ২০টি লাইনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো লবণাক্তসহিষ্ণু জিন সমৃদ্ধ লাইন। লবণাক্তসহিষ্ণু জিন বিষয়ক গবেষণার কাজটি ল্যাবরেটরিতে বায়োটেকনোলজিক্যাল পদ্ধতিতে করা হয়েছে। কাজটি ল্যাবরেটরিতে করা হয়েছে বিধায় এগুলো নিয়ে লবণাক্ত মাঠে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আশা করছি, এ বছরের গবেষণা কাজ শেষে লবণাক্তসহিষ্ণু গমের আরও লাইন পাওয়া যাবে, যা ভবিষ্যতে লবণাক্তসহিষ্ণু গমের জাত হিসেবে অবমুক্তি পাবে।
গত বছরের শেষের দিকে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার হাজীপুরের লবণাক্ত জমিতে একরপ্রতি ৪৮ কেজি গমের বীজ বোনা হয়েছিল। চাষের সময় একরপ্রতি ৬০ কেজি ইউরিয়া, ৬৫ কেজি টিএসপি, ৪৮ কেজি পটাশ, ৫৭ কেজি জিপসাম ও ৩ কেজি বোরন সার দেওয়া হয়েছিল। যখন বীজ বোনা হয়, তখন জমিতে যথেষ্ট জো ছিল। এরপর জানুয়ারি মাসের ৬ তারিখে জমিতে রস কমে গেলে, পাশের পুকুর থেকে পানি দিয়ে সেচ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় একরপ্রতি ৩০ কেজি ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করা হয়েছিল। জমিতে বীজ বোনার ৫৫ দিন পর দ্বিতীয়বার সেচ দেওয়া হয়েছিল। বীজ বোনার ৭৫ দিন পর আরও একবার সেচ দেওয়া হয়েছিল। তিন মাস পর গম কাটার উপযোগী হয়েছে। এখানে লবণাক্ততার মাত্রা ১০-১২ ডিএস/মি.। বলা যায় লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি। জমিতে লবণাক্ততার কারণে ১৫-২০ দিন আগেই গম পেকে গেছে। সুতরাং এই ধরনের জমিতে আমন ধান কাটার পরে বিএডব্লিউ ১১৪৭ ও বিএডব্লিউ ১২৯০ জাতের গমের বীজ বপন করলে হেক্টরপ্রতি ৩-৪ টনের মতো গম পাওয়া যাবে। যা উপকূল অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগাম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যদিও এ বছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, এমনকি মার্চ মাসেও বৃষ্টি হয়নি, কিন্তু গত ৫-১০ বছরের পরিসংখ্যান বলছে প্রায় প্রতি বছর এ সময়ে বৃষ্টি হয়েছে। এই বৃষ্টিপাত হয়তো খেসারির ডালের জন্য ভালো নয়, কিন্তু গমের জন্য ভালো। এ সময় বৃষ্টি হলে গমে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। অধিকন্তু, বৃষ্টিপাতের ফলে মাটিতে লবণাক্ততার তীব্রতা কমে যায়। ফসল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে অবশ্যই ভারি বৃষ্টি হলে গমের জমিতে যেন পানি দাঁড়িয়ে থাকতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
গম চাষাবাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, গম যেন নভেম্বর মাসেই বপন করা যায়। সেজন্য আমন মৌসুমে আগাম জাতের বা স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত চাষাবাদ করতে হবে। যেখানে সেচযোগ্য পানির অভাব আছে, সেখানে ছোট পুকুরের মতো খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। শুস্ক মৌসুমে সেই পানি দিয়ে ২-৩ বার সেচ দিলেই গমের ভালো ফলন নিশ্চিত হবে। প্রতি বছর বাংলাদেশ ৪০ লাখ টন গম আমদানি করে থাকে। এভাবে উপকূল অঞ্চলের পতিত জমিতে গম চাষ করলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং দারিদ্র্য মোকাবিলায় অবদান রাখা যাবে।
লেখকদ্বয় যথাক্রমে ডেপুটি প্রজেক্ট লিডার, ইউনিভার্সিটি অব ওয়ের্স্টান, অস্ট্রেলিয়া
এবং সায়েন্টিফিক অফিসার, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট

বিষয় : গম চাষ

মন্তব্য করুন