ডিজিটাল যুগে পৃথিবী অতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহারের জন্য আমাদেরও বিশ্ব পরিমণ্ডলের অগ্রসরমান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যোগ্যতায় টিকে থাকতে হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষানীতি না থাকলে আমাদের মূল শিক্ষাব্যবস্থাই বিশ্ব পরিমণ্ডলে অগ্রহণীয় হয়ে পড়বে। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, শিক্ষানীতি ২০০৯ প্রণয়নের উদ্দেশ্যকে রিপোর্টে এভাবে বিধৃত করা হয় যে, মানবতার বিকাশ এবং জনমুখী উন্নয়ন ও প্রগতিতে নেতৃত্ব প্রদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, নিজ ও অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত ও পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমী জনশক্তি গড়ে তোলা। ২০০৯ শিক্ষা কমিশনে 'সেক্যুলার এডুকেশনের' বিষয়টিকেও গুরুত্বের মধ্যে নেওয়া হয়েছে, যার ভিত্তিই হবে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
ধর্মীয় স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়েই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে দিকনির্দেশনা সংবলিত শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়। ওই শিক্ষানীতিতে প্রত্যেক ধর্মের কার্যাবলির প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে, শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে, ধর্মের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই শিক্ষানীতির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের প্রথম পঙ্‌ক্তিতেই এটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, 'মাদ্রাসা শিক্ষায় ইসলাম ধর্ম যথাযথ শেখানো হবে। সেইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের জীবন ধারণ সংক্রান্ত ও বিভিন্ন জাগতিক কাজকর্মে পারদর্শী হয়ে ওঠা ও উৎকর্ষ সাধন করার জন্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যথার্থ পারদর্শিতা অর্জনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ বা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ূয়া ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা যেন সমানভাবে অংশ নিতে পারে, সেই লক্ষ্যে মাদ্রাসা শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজানো অপরিহার্য।
শিক্ষানীতিতে একই মানের বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় মধ্যে আনা হয়েছে, যাতে করে মাদ্রাসা থেকে পাস করা কোনো শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে কোথাও নিয়োগের ক্ষেত্রে অবিবেচিত না হয়। বাংলাদেশে মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে মাদ্রসা শিক্ষা বোর্ড। অতিসম্প্রতি মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষার্থীর বাংলা, গণিত এবং ইংরেজি বিষয়ের খাতা অন্য শিক্ষা বোর্ডের অধীন শিক্ষকদের দিয়ে মূল্যায়ন চায় সংসদীয় কমিটি। মাদ্রাসা শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে এই সুপারিশ প্রদান করা হয়, যা অত্যন্ত যৌক্তিক, কেননা একজন পরীক্ষার্থীর এই বিষয়গুলো মূল্যায়ন করতে গেলে সেই বিষয়ে পারদর্শী শিক্ষক প্রয়োজন।
ইসলামী শিক্ষার মধ্যে থেকেই পর্যায়ক্রমে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার মতো শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ল্যাবরেটরি স্থাপন ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণসহ মাদ্রাসাগুলোকে সম্পূর্ণভাবে আধুনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেখানে শিক্ষাদানের জন্য যোগ্য শিক্ষক রয়েছেন কিনা তা বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ না দিলে মাদ্রাসাগুলো সার্বিকভাবে পরিচালিত হতে পারবে না। সেখানে আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। আমরা মাঠ পর্যায়ের তথ্য থেকে জানতে পারি, কিছুদিন আগে পর্যন্ত দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেশ কিছু ডিসিপ্লিন মাদ্রাসার ছাত্রদের ভর্তির ব্যাপারে আপত্তি করছিল। কিন্তু ধর্মীয় বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক হিসেবে রেখেও অন্যান্য ধারার মতো বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কোনো বিষয়ে একই মানের শিক্ষা প্রদান করা হলে মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু শুধু ইসলামী বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করে মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণরা যে সার্টিফিকেট পাবে, তা কখনোই স্কুল ও কলেজের সমমান বলে বিবেচনা করা যাবে না। এই ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে মাদ্রাসাগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বর্তমান রাষ্ট্রীয় ভিত্তিতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও অন্যান্য গুণগত পরিবর্তন আনা আবশ্যক।
এ দেশের সাধারণ মানুষ ধর্মীয় বিবেচনায় মাদ্রাসায় অর্থ অনুদান দেন প্রচুর। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় এ দেশের অনেক রাজনীতিবিদ মাদ্রাসাগুলোকে টার্গেট করে অপপ্রচার করবার প্রয়াস পান। সাধারণ জনগণকে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং বিভ্রান্ত হলে চলবে না। কিছুদিন আগে সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সমকালে তার লেখা 'দেশ ঘুরে এলাম' কলামে বলেন, 'আমার বিস্ময় লেগেছে যে, দেশে নতুন নতুন স্কুল খোলার পরিবর্তে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাদেরও উৎসাহ কোনো অংশেই কম নয়। আমাকে এক ধনী ব্যবসায়ী বন্ধু তার একটি স্কুলের এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে বলার অনুরোধ করেছিলেন। পরে জানতে পারলাম তার এই স্কুলটি বাস্তবে একটি মাদ্রাসা। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার কারণ হিসেবে তার যুক্তি হলো, এতে করে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত থেকে প্রতিনিয়তই যথেষ্ট সাহায্য আসে। তাই আমরা মনে করি, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাও নিঃসন্দেহে একটি চাতুরী ব্যবসা।'
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদ তার দীর্ঘ ২৩ বছর ইউনাইটেড মালয়েশিয়ান ন্যাশনালিস্ট পার্টির মাধ্যমে রাজনীতি ও শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষা, সোশ্যাল, টেকনিক্যাল ও কম্পিউটার শিক্ষা এবং সেইসঙ্গে সমগ্র দেশে সাইবার টেকনোলজিক্যাল সিটিস গড়ে তোলেন। যে কারণে মালয়েশিয়া বর্তমানে পৃথিবীর মানচিত্রে এক শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে ডা. মাহাথির একজন ধার্মিক মুসলিম। প্রকৃত অর্থে ধর্মকে তিনি নিজ চরিত্রে লালন করেন। কিন্তু শিক্ষা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতাকে তিনি প্রশ্রয় দেন না।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একদিকে ধার্মিক এবং অন্যদিকে আদর্শিক প্রেক্ষাপটে একজন প্রগতিশীল নেত্রী। যার দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক অনন্য উন্নয়নমুখী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে। এই গতি আমাদের ধরে রাখতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষক এবং ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই অদ্যবধি ধর্মের মধ্যেই মানবিক স্বাধীনতার ব্যাখ্যা প্রদান করে যাচ্ছেন, বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের স্থলে কাল্পনিক হীনম্মন্যতা তাদের আজও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এর বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন এবং দেশের অন্যান্য মাধ্যমের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য একে অধিকতর আধুনিকায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদযাপনের এই সময়ে আজ দেশের স্বার্থে এ বিষয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে, নতুবা আমাদের মূল শিক্ষা ব্যবস্থাই অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন