দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা ও পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ লাভের জন্য ২০১২ সালে প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। প্রার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে তিনজন প্রার্থীর প্যানেল গঠন করা হয়। তিনজনই ছিলেন নারী প্রার্থী। তিনজনই নারী হওয়ায় এবং নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না বিবেচনা করে ২০১৪ সালে আইন মন্ত্রণালয় পুরো প্যানেলটিই বাতিল করে দিয়ে নতুন প্যানেল তৈরি করতে বলে। আইন মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্যানেলে প্রথম স্থান অধিকারী নারী প্রার্থী হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দাখিল করেন। হাইকোর্ট ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওই রিট আবেদনটি নিষ্পত্তি করে রায় দেন, যেখানে আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে বহাল রাখা হয়। ওই রিট আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশ পায়।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, মুসলিম বিয়ে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব মুসলিম বর-কনের বিয়ে পড়ানো। রায়ে নারীদের ঋতুস্রাব হওয়াকে 'শারীরিক অযোগ্যতা' আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, এটি তাদের ধর্মীয় কাজকর্ম করতে অনুমোদন দেয় না। এছাড়া আরও যুক্তি দেখানো হয়েছে। হাইকোর্ট মনে করছেন, বাস্তব জটিলতার কারণে বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় কাজ করতে এবং বিশেষ সময়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে শারীরিক অযোগ্যতার কারণে নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না। হাইকোর্ট এটাকে 'বৈষম্য' না বলে বলছেন 'বাস্তব প্রয়োজন'। মুসলিম ধর্মীয় আইনে বিয়ের শর্তে বিয়ে নিবন্ধন করার কথা বলা নেই। আমাদের দেশে মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন হয় রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী। এক্ষেত্রে 'মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) আইন-১৯৭৪' এবং 'মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা-২০০৯' অনুসরণ করা হয়। 'মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) আইন-১৯৭৪'-এর ১ ধারায় বলা আছে- 'এই আইনটি বাংলাদেশের সকল মুসলিম নাগরিকের বেলায় প্রযোজ্য হবে।' মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) আইন-১৯৭৪-এর ৩ ধারায় 'বিবাহ নিবন্ধন' বিষয়ে বলা আছে, 'অন্য কোনো আইন বা রীতিনীতিতে ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, মুসলিম আইনের অধীন অনুষ্ঠিত প্রতিটি বিয়ে এই আইনের বিধান অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে। এটি বাধ্যতামূলক, অন্যথায় শাস্তির বিধান আছে।'

আবার বিয়ে নিবন্ধনের পদ্ধতি সম্পর্কে এ আইনের ৭ ধারায় এবং 'মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা-২০০৯'-এর বিধি ২৭(ক)-এ উল্লেখ আছে, নির্ধারিত ফরমে (ফরম 'ঘ') বিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিধান নেই। আবার মুসলিম বিয়ে এবং তালাক (নিবন্ধন) আইন-১৯৭৪-এর ৫ ধারায় বলা আছে- 'যেখানে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিজে কোনো বিবাহ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন (বিবাহ পড়ান) তাৎক্ষণিকভাবে তিনি উক্ত বিবাহ নিবন্ধন করবেন। যদি নিকাহ রেজিস্ট্রার ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি দ্বারা কোনো বিবাহ অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয় তাহলে বিবাহের ৩০ দিনের মধ্যে বিবাহের বর সংশ্নিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের নিকট বিবাহের বিষয়টি অবহিত করবেন এবং নিকাহ রেজিস্ট্রার বিবাহ অনুষ্ঠানের বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর তৎক্ষণাৎ উক্ত বিবাহ নিবন্ধন করবেন।' যে ব্যক্তি দ্বারা বিবাহ পড়ানো হয়েছে তার নাম ও তার পিতা-মাতার নাম বিবাহ নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরমের (ফরম 'ঘ') ২৩ নম্বর কলামে লিখতে হয়। বিবাহ নিবন্ধন হবে সম্পূর্ণ 'মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) আইন-১৯৭৪' ও 'মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা-২০০৯'-এর বিধান অনুসরণ করে। নিকাহ রেজিস্ট্রার ছাড়াও অন্য ব্যক্তি বিবাহের অনুষ্ঠান পরিচালনা বা বিবাহ পড়াতে পারেন এবং বিবাহ নিবন্ধন ফরমে তার নাম ও পরিচয় উল্লেখ করার কলাম আছে। সুতরাং নিকাহ রেজিস্ট্রার যদি কোনো কারণে মসজিদে প্রবেশ করতে নাও পারেন তাহলে তার জন্য বিয়ে নিবন্ধন করার ক্ষেত্রে আইনত বা ধর্মীয়ভাবে কোনো বাধা নেই। একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার পদপ্রার্থীর যোগ্যতা কী হওয়া প্রয়োজন এ বিষয়ে 'মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা-২০০৯'-এর বিধি ৮ এ বলা আছে। এখানে নিকাহ রেজিস্ট্রারের তিনটি যোগ্যতার কথা উল্লেখ আছে। ওই তিনটি যোগ্যতা আছে এমন যে কোনো নারী বা পুরুষ নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার জন্য যোগ্য প্রার্থী।

আমাদের দেশের নারীরা তাদের কর্মদক্ষতা, কর্মক্ষমতা, ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার যোগ্যতা, সাহস অনেক আগেই প্রমাণ করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান অসীম। বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের হাজারো নারী মাঠকর্মী প্রতিদিন মাঠ, ঘাট, খাল, বিল, নদী পার হয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে তাদের সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন এবং সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর নয়, সরকারি-বেসরকারি আরও অনেক পেশা আছে যেখানে নারীদের দুর্গম পথে, খাল-নদী পার হয়ে দিনে-রাতে কর্মক্ষেত্রে যেতে হচ্ছে, তারা যাচ্ছেন এবং সক্ষমতা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারপ্রধান, জাতীয় সংসদের স্পিকারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং বাংলাদেশের নারীদের অদম্য সাহস, দক্ষতা, কর্মক্ষমতা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য কোনোটাই একজন নারীকে নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা নয়, বরং সম্পূর্ণরূপে সহায়ক।

আইনজীবী ও উন্নয়ন কর্মী