ব্রাহ্মণবাড়িয়া আমার শৈশবের স্মৃতির শহর। তিতাসের পাড়ে গড়ে ওঠা এই শহরে যে কোনো জাতীয় দিবসে নৌকাবাইচ হতো। বিস্তীর্ণ দু'পারে হিন্দু-মুসলিম-বৈষ্ণব নারী-পুরুষ-শিশু পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে সেই আনন্দ উপভোগ করত। মনে আছে মেড্ডাতে, কালভৈরব মন্দিরের পাদদেশে তিতাসের কোল ছুঁয়ে শ্মশান, একটা ছোট নালা পেরিয়ে কবরস্থান, আর একটু দূরেই ছিল বৈষ্ণবদের সমাহিত করার স্থান। সব সম্প্রদায়ের মানুষ স্ব স্ব সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুসারে মৃতদেহ দাফন ও দাহ করে একই নদী তিতাসের জলে গোসল করে, স্নান সেরে পূত-পবিত্র হয়ে নিজ নিজ গৃহে ফিরতেন। এই শহরের রাস্তার দু'পাশে নানা রঙের নানান ফুল ফুটত। এক সন্ধ্যায় ফুল ফোটার মৃদু শব্দ আমি এই শহরেই অবাক বিস্ময়ে শুনেছিলাম। টাউন হলে পি.সি. জুনিয়রের জাদু দেখেছিলাম। কৃষি মেলায় বাবার হাত ধরে মাঠময় ঘুরেছিলাম। মাগরিবের সময় পার হলেই প্রায় সব বাড়ি থেকে সুর সাধার, গানের আওয়াজ ভেসে আসত। এই মহকুমায় সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ জন্মেছিলেন। শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ শহর। একাত্তরে হাজারো মানুষ মুক্তিযুদ্ধে গেলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আমার অবাধ বিচরণের, বৈশাখী মেলা থেকে গুড়ের বাতাসা খেতে খেতে ভাইবোন ও খেলার সাথিদের সম্মিলিত আনন্দ-উল্লাসে হাতভর্তি খেলনা নিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরার শহর। নৌকায় চড়ে শহরের বুকে ছড়ানো তিতাসের খালে শরতের মেঘের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো। এই শহরের বড় মসজিদের হুজুরের কাছে আমি প্রথম কোরআন শরীফ পাঠ খতম করেছিলাম।

পঁচিশ বছর আগে এই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজকদের ওপর হামলা করা হয়েছিল। সেদিন হামলাকারীরা আগত নারী ও শিশুদের ওপরও চড়াও হয়েছিল। মারধর করেছিল। সেদিনও তাদের বর্বরোচিত হামলা দেখে তাজ্জব বনে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ পঁচিশ বছর পরে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির সময়ে একজন রাষ্ট্রীয় অতিথির আগমন উপলক্ষে এই স্মৃতির শহর জুড়ে একি তাণ্ডব দেখলাম দু'দিন ধরে! হেফাজতে ইসলামের এই আচরণ শান্তির ধর্ম ইসলামের পরিচয় বহন করে কি? এতে কার লাভ হলো বুঝতে পারছি না। তবে সাধারণ মানুষ ও ধর্মের কোনো লাভ হয়েছে বলে বিশ্বাস হয় না।

আল্লাহ বা ভগবান বা গড মানুষে মানুষে ভেদাভেদ চান না বলেই এক তিতাসের জলে মসজিদ, মন্দির, গির্জা পূত-পবিত্র,পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করার ব্যবস্থা রেখেছেন; অদৃশ্য বাতাসের অক্সিজেনে সবার প্রাণ রক্ষা পায়। তবু মনের আঁধার ঘোচে না। একটু উস্কানি পেলেই ভাঙচুর, মারধর শুরু হয়ে যায়। এভাবে কি মানুষের ধর্ম বাঁচে? না বাঁচানো যায়?

১৯৪৭ সালে দাঙ্গা রোধে মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে এসেছিলেন। মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধে সেদিন দাঙ্গা রোধ সম্ভব হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫০ ও ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনকালে দাঙ্গা হয়েছিল। নারী নেত্রী সুফিয়া কামাল, লীলা রায়, লুৎফুন্নেসাসহ আরও অনেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে দাঙ্গা বন্ধ করেন। মুসলিম লীগ সরকারের উস্কানিতে খুলনা জেলার কালশিরা গ্রামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৬৪-১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত সীমান্ত যুদ্ধকালীন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সাম্প্রদায়িক হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন হয়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা এদেশের মুসলমানদের খাঁটি মুসলমান মনে করত না। এদেশীয় জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির, আলবদর, আলশামস বাহিনী ছিল তাদের দোসর।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে এবং কাশিপুর, নাচনী, চণ্ডীপুর গ্রামে যে ভাঙচুর হলো, তার কোনো সদুত্তর আছে কি? ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে, ২০১৩ সালে পাবনার সাঁথিয়ায়, ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে, রংপুরের গংগাচড়ায় ও সদর ইউনিয়নে; ২০২০ সালের ১৫ মে ভোলার মনপুরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন লাগানো ও ভাঙচুর হলো। অভিযোগ একই। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার কথা বলা। এভাবে আর কত দিন? যাদের ওপর হামলা করা হচ্ছে তারা বংশপরম্পরায় বাংলাদেশের নাগরিক, এই মৌলিক সত্য কথাটা সবসময়ই হামলাকারীরা ভুলে যান। এও ভুলে যান যে, এদেশে আইন-আদালত আছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীদের প্রিয় জন্মভূমি, প্রিয় স্বদেশ। উল্লিখিত ঘটনাগুলো সবার জানা। এসব ঘটনার কোনোটিই হঠাৎ করে ঘটেনি এবং বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাও নয়। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এই ধারাবাহিক বর্বরোচিত ঘটনা আর কত দিন ও কত বছর ধরে চলবে? ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজ এক্ষেত্রে তাদের দায়বদ্ধতা বিস্মৃত হয়েছে কি? নইলে ঘটনা ঘটে চলছে কেমন করে? এসব ঘটনার মূল উৎপাটনের করণীয় পরিকল্পনা কোথায়? করোনাকালে কোনো কিছু তো এক স্থানে স্থির হয়ে বসে নেই।

২৬ মার্চে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে তাণ্ডব দেখাল; সেখানে রেলওয়ে স্টেশনে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধে আগুন দিল- তা ক্ষমার যোগ্য নয়। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। সব নাগরিকের সমান অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ভোগ সংবিধানে স্বীকৃত। একটা কিছু ইস্যু পেলেই নাগরিক মনে আতঙ্ক সৃষ্টির প্রয়াসে জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের তাণ্ডব কর্মকাণ্ড থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতা ও কর্মীদের সরে আসতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ধার্মিক। তাদের কর্মকাণ্ড ধার্মিকদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানে। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং অন্য ধর্মের নাগরিকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে উদার। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্ম এবং শিক্ষানীতি একত্রিত করা অনুচিত। রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমান। মানুষ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টির সেরা জীব। তার আচরণ, চাল-চলন তেমন আদর্শনীয় হওয়া উচিত। আমাদের শিক্ষা কর্মসূচিতে কলেজ পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের 'গোরা' উপন্যাস এবং সাহিত্যিক আবুল ফজল রচিত 'মানবতন্ত্র' বাধ্যতামূলক হওয়া দরকার। মানবিক মনমানসিকতা নির্মাণে এই উপন্যাস এবং প্রবন্ধগ্রন্থ অতুলনীয়। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক দেশ হয়ে উঠুক আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, চিন্তা-চেতনায়, সুবুদ্ধি-বিবেচনায়। শুধু আয়ু এবং অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে নয়।

নারীনেত্রী

মন্তব্য করুন