কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে সংবাদ সোসরু কাশ্মীরিকে এক সাক্ষাৎকারে বললেন, 'মি. জিন্নাহর পাকিস্তান দাবির মধ্যে গভীর বিপদ নিহিত। আরও একটি বিষয় গুরুতর। অবশ্যই মি. জিন্নাহর নজর এড়িয়ে গেছে, বঙ্গদেশ। তার অজানা, বঙ্গদেশ অন্যের তথা বাইরের নেতাগিরি, নেতৃত্ব মেনে নেয় না। অস্বীকার করবে। আজ হোক কাল হোক। আমার বিশ্বাস, পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের দাপট অসহনীয়, একসঙ্গে থাকা আদৌ সম্ভব নয়। দুই পাকিস্তানের ধর্ম ভিন্ন অন্য কোনো বাঁধন নেই। আমরা মুসলমান- এই বোধে স্থায়ী রাজনৈতিক মহব্বত, ঐক্য গড়ে ওঠা অসম্ভব।'

জিন্নাহ শিক্ষা নেননি মাওলানা আজাদের কথায়; কানেও তোলেননি। পশ্চিম পাকিস্তান শোষণ করছে পূর্ব পাকিস্তান। বঞ্চিত করছে সবদিক থেকে। পাট তৈরি হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে, দাম নির্ধারিত পশ্চিম পাকিস্তানে। ফসলের দামও। এবং দামের অর্ধেক পাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তানের আপেল, আঙুর, পশমের পোশাক ইত্যাদির দাম পূর্ব পাকিস্তানে দশ গুণ। পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকার আয়েরও ভাগীদার পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার। বৈষম্য-ব্যবধান এতটাই; কেউ প্রতিবাদ করলে রাষ্ট্রদ্রোহী, পাকিস্তানবিরোধী, ইসলামবিরোধী; অত্যাচার, গ্রেপ্তার, জেল-জুলুম।

১৯৪০ সালে মার্চে লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব। ১৯৬৬ সালে লাহোরেই পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর সম্মেলন। ওই সম্মেলনে আওয়ামী লীগের ছয় দফা উত্থাপন- 'ছয় দফার আন্দোলনেই নিহিত শক্তিশালী পাকিস্তান গড়ার।' না বলেও উপায় ছিল না তখন। ছয় দফার মধ্যে যেমন শর্তাবলি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ লুক্কায়িত। পাকিস্তানের গোয়েন্দাকুল, পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা শাখা ঠিকই আঁচ করে দুই পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার, বিভাজনের। শেখ মুজিবুর রহমান ঝানু রাজনীতিক। ছয় দফার প্রতিটি দফায় যে যুক্তি পরতে পরতে, দুই পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী বলা মুশকিল। কিন্তু পাকিস্তানের গোয়েন্দাকুল, সামরিক ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ ছয় দফার মধ্যে পাকিস্তানের ভাঙন স্পষ্ট দেখতে পায় ভবিষ্যতে। 'ছয় দফা আগরতলা ষড়যন্ত্র'- এই তকমায় আওয়ামী লীগ দোষী, অপরাধী। রেহাই নেই আওয়ামী লীগের, শেখ মুজিবুর রহমানের।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে বহুমান্য কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মণি সিংহ বলেছেন, '১৯৫১ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন'- খবর দৈনিক সংবাদ-এর। বঙ্গবন্ধুর ৫৩তম জন্মদিনে প্রকাশিত মণি সিংহের 'সংগ্রামের নোটবুক' থেকে।

ছয় দফার পক্ষে ১৯৬৬ সালের মার্চ থেকে টানা বক্তৃতা জনসভা আওয়ামী লীগের, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। ঢাকা চট্টগ্রাম যশোর খুলনা ময়মনিসংহ সিলেট পাবনা ফরিদপুরে বক্তৃতার পরে গ্রেপ্তার, জেলে। বেশিদিন আটকে রাখা মুশকিল, আইনের প্যাঁচে, ফাঁকফোকরে মুক্তি। যদিও তা সাময়িক। পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান বরদাশত করতে নারাজ ছয় দফা আন্দোলন এবং যথারীতি তকমা এঁটে দিয়েছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রের। আগরতলা ষড়যন্ত্রের ধুয়া তুলে দেশরক্ষা আইনের নামে বারবার গ্রেপ্তার ৮ মে ১৯৬৬ সাল থেকে। তার পর থেকে গোটা বাংলাদেশ উত্তাল।

তৃতীয় সপ্তাহ থেকেই মূলত শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য গোটা পূর্ব পাকিস্তান মরিয়া। আন্দোলন এতটাই তুঙ্গে- পাকিস্তানি নেতারা দিশেহারা। ১৪৪ ধারা জারি, কারফিউ, বুলেট, হত্যা। জনতা বেপরোয়া, পথে পথে, একাকার। এসে যায় বিখ্যাত ১৯৬৯ সাল- বাংলাদেশের ইতিহাসে '৬৯-এর আন্দোলন' নামে খ্যাত। মনে পড়ছে সে সময়ের কিছু স্লোগান- 'জয় বাংলা', 'তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা-মেঘনা-যমুনা', 'জেলের তালা ভাঙবো/ শেখ মুজিবকে আনবো', 'ঢাকা না পিন্ডি/ ঢাকা ঢাকা', 'চটকাও পিন্ডি পাকিস্তানের পিন্ডি', 'পাঞ্জাব না বাংলা/ বাংলা বাংলা,' 'আমার দেশ তোমার দেশ/ বাংলাদেশ বাংলাদেশ'। লক্ষণীয়, প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন-স্লোগানে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা নয়; সরাসরি বাংলাদেশ। এর মধ্যে গোটা তিনেক স্লোগান এই লেখকের লেখা।

ঘটনার দ্রুত পট পরিবর্তন। বিস্তারিত ইতিহাস বহু বইয়ে উল্লিখিত। একটি ঘটনা চোখে উজ্জ্বল এখনও। ঢাকায় কারফিউ ঘোষিত হয় ৩ মার্চ (১৯৭১)। মালিবাগ ট্রাফিক আইল্যান্ডে আমরা ব্যারিকেড তৈরি করছিলাম। মিলিটারির একটি ট্রাক ছুটে এসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। ফারুক ইকবাল লুটিয়ে পড়ে চোখের সামনে। এক মিনিট আগেই ওর পাশ থেকে সরে এসেছিলাম; ইট-পাথর আনার জন্য। ফারুক ইকবাল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম শহীদ।

এলো ৭ মার্চ। রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ বেলা ২টায়। আমাদের মালিবাগের বাসা থেকে রেসকোর্সের ময়দান দুই মাইলও নয়। সকাল ১০টায় হাজির, পাছে মঞ্চের সামনের জায়গা যদি না পাই! তিল ধারণের জায়গা নেই- অনেকেই গাছে চড়ে, রেসকোর্সের আশপাশের বিল্ডিংয়ের ছাদেও। উনিশ মিনিটের বক্তৃতা বঙ্গবন্ধুর- 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' আর কোনো ঘোষণার দরকার নেই। এই দিনই মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা। পরের ইতিহাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদ। স্বাধীনতা।

২৫ মার্চ রাত ১২টার পর থেকেই শুরু হয় পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ। জেনোসাইড। ২৭ মার্চ থেকে ভারতে উদ্বাস্তু' নভেম্বরের শেষেও। ভারতই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার সহায়ক। ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে। ইন্দিরার অবদান চিরস্মরণীয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীও। স্যালুট। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ধার্য। কারণ ২৫ মার্চ রাত থেকেই পাকিস্তানের হত্যালীলা। পাকিস্তানের পতন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়। জয় বাংলা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর। যুক্ত পাকিস্তান আড়াই দশকও টেকেনি। ধর্ম, দ্বি-জাতিতত্ত্ব কোথায়? ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন। ওই দিনে ওই মাসে, ওই বছরে পশ্চিম পাকিস্তানের নামকরণ শুধুই পাকিস্তান। এক অর্থে নতুন পাকিস্তানেরও জন্ম; অর্থাৎ এ বছর পাকিস্তানেরও ৫০ বছর।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত। সংবিধানে মূল চার নীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর চার নীতিই লোপাট। বহিরঙ্গে গণতন্ত্রের লেবাস। ভোট হয় বটে।

'বাঙালি জাতীয়তাবাদ'-এর বদলে বিএনপির সেনা-রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান 'সৃষ্টি' করলেন 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ', অর্থাৎ মুসলিম জাতীয়তাবাদ। বাঙালি খারিজ। জিয়াউর রহমান স্বৈরশাসক। নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীকে ঘরে ডেকে এনে কোলে ঠাঁই দিলেন। পাকিস্তানের নাগরিক জামায়াতে ইসলামীর 'আমির' গোলাম আযমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান। যুক্তি- তিনিও মূলত বাংলাদেশের। পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান 'বিচ্ছিন্ন' হওয়ায় পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

আরেক স্বৈরাচারী শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আরও এককাঠি সরেস। সংবিধান আগেই কাটাছেঁড়া হয়েছে। সংবিধানে যোগ করা হলো 'বিসমিল্লাহ', 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম'। কোনো রাজনৈতিক দলই তীব্র প্রতিবাদ করল না; বিক্ষোভ, মিছিল করল না। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ধর্ম কি বাংলাদেশ থেকে উধাও? তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক নয়? হলে, দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা টানা এক দশকের বেশি বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী। প্রথমবার ক্ষমতায় আসার আগে অঙ্গীকার করেছিলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন। বরং ধর্মীয় রাজনীতিকে আরও বেশি আঁকড়ে ধরেছেন। ইসলামী দেশ ও ইসলামী দলগুলোর কাছে প্রায় জিম্মি। জেলা-উপজেলা-থানা-গ্রামে অজস্র মাদ্রাসা। সরকারি অর্থসাহায্যে পুষ্ট। বিজ্ঞানের স্কুল ও কলেজ আতশ কাচ দিয়ে খুঁজতে হয়। এও বাহুল্য। ফতোয়াবাজ ইসলামী মোল্লা-মৌলভির দাপট ক্রমাগত বাড়ন্ত। সরকার ধরি মাছ না ছুঁই পানি। ইসলামী পেট্রোডলার দেশগুলোর মুখাপেক্ষী। নিশ্চুপ। মৌন।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের নানা চেহারা। বঙ্গবন্ধু হত্যা। দুই সামরিক শাসক। জিয়াউর রহমানকে হত্যা। তিনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এর পর দুই নারী প্রধানমন্ত্রী। এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ একশর বেশি রাজনৈতিক দল। ইসলামিক দলের হরেক শর্ত, দাবিদাওয়া থেকে বাংলাদেশ বেরোতে পারছে না। বরং মেনে নিচ্ছে। বাংলাদেশে ইসলামিক দলগুলো যত সোচ্চার, মাথাচাড়া দিচ্ছে; অন্য প্রগতিশীল দলগুলো অতলে। একদা কমিউনিস্ট পার্টি ছিল আদর্শ, বহুমান্য। এখন প্রায় অস্তিত্বহীন। মাঝেমধ্যে সংবাদমাধ্যমে।

স্বাধীনতার পর থেকেই মালয়েশিয়াসহ ইসলামী মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিক। বিদেশে এক মিলিয়নের বেশি বাংলাদেশের নাগরিক। শ্রমিক, চাকরিজীবী, পড়ূয়া। শান্তির তকমায় মুহাম্মদ ইউনূস নোবেলজয়ী। ফজলে হাসান আবেদের ব্র্যাক বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও। নারীশিক্ষা। ৯২ ভাগ স্কুলে ছাত্রী। নারীর অধিকার, সংগঠন জোরালো। গার্মেন্ট শিল্পে ৮০ ভাগের

বেশি নারীকর্মী। বিদেশে শ্রমিক এবং গার্মেন্ট থেকেই মুখ্য আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা। ক্রমাগত বাড়ন্ত।

পঞ্চাশ বছরের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের পতন ও উত্থান লক্ষণীয়। এখন আর 'তলাবিহীন ঝুড়ি' নয়। নিক্সন আমলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের বিখ্যাত উক্তি। বছর ১৫ আগে ওঁর সাথে দেখা, বার্লিনের 'হাউসজের কুলটুরেন জের ভেল্ট' আয়োজিত উদ্বাস্তু ও বিশ্ব সংস্কৃতি অনুষ্ঠানে। অনেকের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে পরিচিত হলেন। হাত বাড়িয়েছিলাম। তিনিও। দুই হাত মিলনের আগে জিজ্ঞেস করেন- ফ্রম হুইচ কান্ট্রি য়্যু আর? ভেবেছিলেন ভারতীয় বা পাকিস্তানের। বললাম, বাংলাদেশের। হাত সরিয়ে নেন। নিলেও, কিসিঞ্জারকে প্রশ্ন করলাম- 'সো, য়্যু আর দিস ম্যান, হু সেইড বাংলাদেশ ইজ অ্যা বাস্কেটলেস?' উত্তর দেননি। দেওয়ার মুখ ছিল না।

আমেরিকা আজ তাকিয়ে দেখুক পাকিস্তান, বাংলাদেশকে। বিশ্বব্যাংক বলছে (চলতি বছরের মার্চের রিপোর্টে), 'বাংলাদেশ হ্যাজ লেফ্‌ট বিহাইন্ড পাকিস্তান ইন এভরি অ্যাসপেক্ট। পার ক্যাপিটা ইনকাম ২০৬৪ মার্কিন ডলার। জিডিপি :৫২, ব্যাংক রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলার। প্রাথমিক শিক্ষা ৯৮ স্কুলে। পাকিস্তানের ২০ বিলিয়ন ডলারও নয়। স্কুল শিক্ষায় আরও নিল্ফেম্ন।

বাংলাদেশের ৫০ বছরের স্বাধীনতার যে গৌরব; পাকিস্তান তুচ্ছ। ধর্ম ও দ্বি-জাতিতত্ত্ব গৌণ।

বাংলাদেশ স্বাধীন; ৫০ বছরে বাংলাদেশ বৈশ্বিক, গরীয়ান।

বাংলাদেশ ও বাঙালির মাথা সর্বত্র উঁচু। জয় বাংলা!

বার্লিন প্রবাসী কবি

মন্তব্য করুন