বিশ্বে আছে অনেক দেশ, অনেক জাতি। কিন্তু যত দেশ বা জাতিই থাকুক, আমাদের প্রথম পরিচয়- আমরা মানুষ। এই ভূ-স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা উদযাপন করলাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনা আজও নানা ক্ষেত্রে, নানাভাবে আক্রান্ত।

দেখছি কুচক্রীরা এমন বিষ খাইয়েছে, যে বিষ দেহমনে বিকার সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষেত্রে রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাই কি আগে দরকার নয়? সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে আছে আজও এই রক্তস্নাত বাংলাদেশে। এরই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও। এ থেকে পরিত্রাণে সবার আগে দরকার মানুষে মানুষে বিশ্বাস সৃষ্টি এবং জাতিতে জাতিতে ও বর্ণে বর্ণে সম্প্রীতি স্থাপন। নির্বিচার শোষণ এবং নির্লজ্জ অত্যাচারও অনেক সময় এ ধরনের মানসিকতা সৃষ্টিতে ইন্ধন জোগায়। এ ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানে গাছের মাথায় পানি না ঢেলে এর গোড়ায় দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। উন্নত চরিত্রের মানুষ সব দেশকেই নিজের দেশ ভাবে। সব ঘরকেই মনে করে নিজের ঘর। তাদের কাছে অনাত্মীয় বলে কেউ নেই। দৃষ্টি সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হলে ভাষা, ধর্ম বা সাংস্কৃতিক অনৈক্য মুছে যেতে পারে। মাদার তেরেসা কত দূরদেশের মানুষ! কিন্তু তিনি নিজগুণে কত সহজে পরকে আপন করে নিলেন! কত অনায়াসে বুকে তুলে নিলেন অন্য দেশের অসহায় শিশুদের! ভগিনী নিবেদিতা সাগরপাড় থেকে এসে সাত সাগরের সুধা ঢাললেন মানুষের কল্যাণে। এ দেশই যে তার নিজের দেশ হয়ে উঠেছিল, তা কি তার অতি বড় বিরোধীরাও অস্বীকার করতে পারেন? শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাজ করে গেলেন দূরদেশি এলম হাস্ট, পিয়ারসন প্রমুখ মনীষী। বিদেশকে স্বদেশ ভাবতে পেরেছিলেন বলেই না তাদের পক্ষে এই ত্যাগ সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশেরও অনেকে দেশে-দেশে নিজের দেশকে খুঁজে পেয়েছেন।

সমাজ সম্পর্কে সহানুভূতিশীল না হলে স্বদেশের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রক্ষা করা যায় না। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সিলেট থেকে মেহেরপুর পর্যন্ত বিস্তৃত বাংলাদেশের সামাজিক ঐক্য বিশ্নেষণ করলে সমাজ-চেতনার ধারণাটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ নানা ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী, জাতি-উপজাতি-সম্প্রদায়ের মানুষের আবাসস্থল। বিচিত্র তাদের সংস্কার, আচার-অনুষ্ঠান। তথাপি এই বৈচিত্র্যময় সমাজের মধ্যে রয়েছে একটি ঐক্যসূত্র। সেই ঐক্যসূত্রটি হলো, এ দেশের নাগরিক আমরা সবাই। বিচিত্র ধর্ম ও বর্ণের মানুষ হলেও আমরা বাংলাদেশেরই অধিবাসী- এই সত্য সর্বদা আমাদের কাছে প্রতিভাত। এই ধারণাকে আমরা বলতে পারি স্বদেশ ভাবনা। এর বাইরে একটা শ্রেণি আছে, যারা মানুষকে নিপীড়ন-নির্যাতনের খÿ নিয়ে তাড়া করে। কখনও গুজবে কান দিয়ে, কখনও অত্যন্ত সচেতনভাবে হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণের লক্ষ্যে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। হানাহানি, রক্তারক্তি, খুনোখুনি, লুটপাট, মানুষের ওপর আঘাত ইসলাম কখনও সমর্থন করে না। আমরা যেন ভুলে না যাই- মানুষের ওপর মানুষের আঘাত-আক্রমণ পাপ। এও সত্য- স্বদেশপ্রেমের মূলেই আছে মানবপ্রেম।

বিদ্বেষ নয়, সখ্যের পথেই আমাদের জীবনসংগ্রাম সিদ্ধ হতে পারে। নাগিনীরা ফেলেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস। তাই কখনও কখনও অবিশ্বাস ও সহনশীলতার অভাব কোথাও কোথাও প্রকট হয়ে পড়েছে। আমাদের সমাজেও এর বিরূপ ছায়া পড়েছে কখনও কখনও। রামু, নাসিরনগর, সাঁথিয়া, নোয়াগাঁও এরই দৃষ্টান্ত। মনুষ্যত্ববোধ ছাড়া দেশ-সমাজ আলোকিত হয় কী করে? অমানবিকতার মূলোচ্ছেদই হোক আমাদের প্রত্যয়। মানুষ যদি না হয় মানুষ, তাহলে সমাজে অন্ধকারেরই বিস্তৃতি ঘটবে। কালজয়ী শিল্পী ভূপেন হাজারিকা তার কণ্ঠে এই শব্দাবলিই উচ্চারণ করেছেন সুরে সুরে। আজকের বাস্তবতায় এর চর্চা খুব জরুরি। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার- এই বাণীর মর্মার্থ যারা উপেক্ষা করে, তাদের এই উপেক্ষার পেছনে হীনস্বার্থ রয়েছে। এই দেশটা হবে মানুষের- এই প্রত্যয়ই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার। কিন্তু স্বাধীন দেশেও মানুষরূপী অমানুষ রয়ে গেল। ক্রমে ক্রমে সংখ্যায় বাড়ল। সক্রেটিস বলে গেছেন- 'নো দাইসেল্‌ফ'। কথাটি অবশ্যই জীবন চলার চাবিকাঠি। এই দেশ, এই সমাজ একান্তই হোক মানুষের; অমানুষের নয়।

সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী

মন্তব্য করুন