পৃথিবীর অনেক চিন্তাশীলের মতে, তাদের জানাকালে সবচেয়ে ন্যায়বান, জ্ঞানী ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন এথেন্সের সক্রেটিস। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ৭০ বছর বয়সে সক্রেটিসকে আদালতের সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল। বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল এবং হেমলক নামে বিষ পান করিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাকে হত্যা করেছিল। তার বিরুদ্ধে আনীত তিনটি অভিযোগের কোনোটিরই প্রমাণ হয়নি যথাযথভাবে। কিন্তু তাতে সক্রেটিসের প্রাণদণ্ড রহিত হয়ে যায়নি। সে সময়ে এই মৃত্যুদণ্ড ছিল এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। সক্রেটিস জ্ঞানবৃদ্ধ, জ্ঞানসাধকদের প্রশ্ন করে করে তাদের জ্ঞানের অভাব প্রমাণ করতেন। সক্রেটিস তাদের জ্ঞানের দম্ভ চূর্ণ করতেন এই বলে- তারা এতটাই অজ্ঞানে আছেন; জানেনই না যে তারা অজ্ঞ। এমনটাই বাড়াবাড়ি করতেন সক্রেটিস। তাই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল জ্ঞানপাপীর দল; গণতান্ত্রিক এথেন্স সরকার।

প্রগতিশীল সমাজে মানুষকে শেখানো হয়- কোনো জিনিস চলে আসছে বলেই যেন সেটাকে মেনে নেওয়া না হয়। যা সত্য-সুন্দর আর ন্যায়, তাকেই মানতে হবে। নিজের প্রতি সৎ থাকার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংশয়বাদী হওয়ার উপায় নেই।

প্রক্রিয়াটি নতুন নয়। বাংলাদেশ জন্মের কাল থেকেই এর অস্তিত্ব শুরু হয়েছিল। তবে ইদানীং এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের ভাগ হয়ে যাওয়ার অধিকার আছে। কেননা, কারও কারও সংশয় থাকতেই পারে, যেখানে অন্যদের কাছে তা পরিস্কার। গণতন্ত্রকে তো সম্মান দিতেই হবে। অন্যের কথা শোনা এবং নিজের কথা বলার ক্ষমতা গণতন্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষা। তা ঠিক ছিল যতদিন বুদ্ধিজীবী বলে একটা শ্রেণি নিজেদের মধ্যে মতবাদ নিয়ে ভিন্নতার রোগে ভুগতেন। সমস্যাটা তখনই শুরু হলো, যখন তারা রাজনীতির আঁচলে প্রবেশ করলেন। রাজনীতির বুদ্ধিজীবী সেলে নিয়োগ পর্ব এখন পুরোদমে দৃশ্যমান। এর কিছুটা ওপেন; অনেকখানিই গোপন। পত্রপত্রিকায় কলাম লেখা, টিভি চ্যানেলে মুখ দেখানো, সোশ্যাল মিডিয়ায় গলা ফাটানো, সভা-সমাবেশে হাজিরা দিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিটি বাজারজাত করা, দল বেঁধে বেছে বেছে সমমনা বুদ্ধিজীবী সেজে বিবৃতি দেওয়া- এসব প্রাত্যহিক প্রয়োজনের ঘনঘটা বহুলাংশে নব্যপ্রযুক্তির উপজাত। ফলে চাহিদা-জোগানোর অঙ্ক মেনে রাজনৈতিক দলগুলো নিজস্ব ভাবুক শ্রেণির কলেবর বৃদ্ধি করার সুযোগ পেয়েছে। সেই সঙ্গে রাজনীতির ভাগ্যলক্ষ্মী আবার কাউকে কাউকে কৃপা করেছে; খালি থালাটা পরিপূর্ণ করে দিয়েছে, বিশেষ করে যাদের দরবারে 'বুদ্ধিজীবী' কিঞ্চিৎ ঘাটতি পড়েছিল। ক্ষমতার টানে, ভাগ্যলক্ষ্মীর আহ্বানে নতুন মুখের ভিড় বেড়েছে, শিবির বদল হয়েছে, আরও কত কী! লোভ আর লাভের প্রবণতার পালে শন-শন হাওয়া বয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বিভক্ত বুদ্ধিজীবী অথবা দলীয় বুদ্ধিজীবীতে সমস্যাটা কোথায়? যে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শেরই একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি থাকে। সেখানে কোনো কোনো বুদ্ধিজীবীর নাড়ির যোগ থাকতে পারে। আবার রাজনীতির দৈনন্দিনতার বৃত্তেও বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা থাকতে পারে। সরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক, রাজনীতির থিঙ্কট্যাঙ্ক এগুলো সভ্য সমাজের গণতান্ত্রিক রাজনীতির সহায়ক শক্তি হিসেবেও আসতে পারে। কোনো সমস্যা নেই যতক্ষণ তারা তাদের কাজটি খোলাখুলিভাবে করছেন, যতক্ষণ তারা স্বীকার করছেন তাদের বুদ্ধিটুকু শুধু একটি গোষ্ঠী এবং একটি রাজনীতির জন্য ব্যয় হচ্ছে, ততক্ষণ তাতে নিন্দার জায়গাটুকু খুঁজে পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বুদ্ধিজীবী যদি পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হতে চান, তবে তো বিষয়টি আলাদা। তিনি যুগের প্রতিশ্রুত স্বরকে স্বকণ্ঠে ধারণ করবেন- এমনটাই আশা তার কাছে। তার বার্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব, দর্শন ও যুক্তি একই সঙ্গে জনগণের হয়ে এবং জনগণের উদ্দেশে গঠিত ও বিবৃত হবে। সরকার, ক্ষমতা, বিশেষ শ্রেণির রাজনীতি বা প্রতিষ্ঠান তাকে কখনও আত্মসাৎ করতে পারে না। সেখানে সংশয় কিংবা ধোঁয়াশার কোনো জায়গা নেই। হাততালি কিংবা চুনকালি কোনো কিছুই তার কাছে প্রাধান্য লাভ করে না। সক্রেটিস, সলঝিনেৎসিন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন- তারা পেরেছেন তা করতে।

কিন্তু আমাদের সমাজ আজ কূপমণ্ডূক সমাজে পরিণত। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা মন ছোট থেকে ছোট পরিসরে সংকুচিত করে নৈরাশ্যের সাধনা করে চলেছেন। তাই শিল্প, শিক্ষা, জ্ঞান, মেধা আজ অধঃগামী। দলীয় রাজনীতির হাতে বন্দি দেশের বুদ্ধিজীবী বিবেক। দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ এবং আত্মঘাতী রেষারেষির ঊর্ধ্বে উঠে জয়ী হতে পারছে না সমাজ। এখানে দক্ষতা আর মেধার জয় হচ্ছে না; উৎকর্ষ আর যোগ্যতার মর্যাদার দ্বার খুলে যাচ্ছে না বিকশিত সংস্কৃতির জন্য; বিরাজ করছে না যথাযথ গণতন্ত্র। এসব বিষাক্ত তুচ্ছতা ও বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সমবেত শুভবুদ্ধির অবস্থান থেকে সমস্বরে দাবি জানাতে পারছে না নাগরিক সমাজ।

একজন বাঙালি ও একজন নাগরিক হিসেবে এই ঘটনাক্রম আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে। যা হচ্ছে, তা বাংলার সংস্কৃতিবিরোধী। সাহিত্য, বিজ্ঞান আর প্রগতিশীল মনন বাংলাকে এক দিন আন্তর্জাতিক স্তরে অগ্রগণ্যের অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। বর্তমান অবস্থান সেই চরিত্রের বিরোধী। এ অবস্থান থেকে দেশকে রক্ষা করতে যে শ্রেণির দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি, তারাই আজ পরজীবী এবং বিভক্ত। দেশ ক্রমে সংখ্যাগুরুবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যারা সমাজের এই পতনের দিকটা নিয়ে গবেষণা করবেন, ভাববেন, অন্যকে শিক্ষা দেবেন; তারা আজ যেন নিজসৃষ্ট বলয়ের বাইরে আসতে পারছেন না। নিচের মানুষদের সঙ্গে যাদের ভাববিনিময়ে পাল্টে যাবে হীনতা-ভিন্নতা; তারাই আজ ভিন্নতার রোগে আক্রান্ত। তাহলে আলোর রেখা নিয়ে সামনে এগোবে কারা? ধর্ম, গোষ্ঠী, পরিচয় আর রাজনীতিতে ধর্মের নামে মেরুকরণের উস্কানি- এসব থেকে সাধারণ মানুষকে বের করে আনতে যে আলোর দরকার, তা যাদের হাত ধরে ছড়াতে পারত, তারা আজ নিজেরাই বিভেদের অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই বিভেদ ঘুচবে কী করে?

অবসরপ্রাপ্ত মেজর ও কলাম লেখক
ceo@ilcb.net

মন্তব্য করুন