এ কথা নিঃসংকোচে বলা যায়- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন করে দুর্যোগে-দুর্বিপাকে অসামান্য প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন; তেমনি একাগ্রতা নিয়ে বহুবিধ ভূ-রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাই তো এক যুগ আগে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে দেশের দায়িত্বভার কাঁধে নেওয়ার পরও তিনি দ্রুত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পেরেছিলেন। উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রেখেছেন বলে এর সুফল পৌঁছে গেছে একেবারে প্রান্তিক মানুষের কাছে। প্রধানমন্ত্রী অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন বলেই করোনার ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অধিকাংশ দেশের চেয়ে ভালো করেছে। সফলতা এসেছে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও।

প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত অর্থেই তার পিতা বঙ্গবন্ধুর মতো বাংলাদেশের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থের বিষয়ে সদা-সচেতন। এ জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে তিনি কখনোই পিছপা হননি। তাই তিনি যখন ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রত্যয় ঘোষণা করেন, তখন অবাক হইনি। সত্যিই, তামাক বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অভিশাপ। অমিত সম্ভাবনার বাংলাদেশ সম্পর্কে যখন জানা যায়, এ দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তামাক ব্যবহারকারী দেশগুলোর একটি, তখন বিবেকবান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই ভাবিত হয়ে ওঠেন।

আমি নিজে চরাঞ্চলের মানুষ। সারাজীবন চরের মানুষের জন্য রাজনীতি করেছি। এখনও তাদের ভোটেই জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছি। তাই তামাক প্রসঙ্গে ভাবনায় প্রথমে আমার সেই চরের মানুষদের কথাই মনে আসে। বৈরী প্রকৃতি আর নানামুখী আর্থসামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই টিকে থাকে চরের মানুষ। বর্তমান সরকারের আমলে নানামুখী উদ্যোগের মাধ্যমে চরের মানুষকে উন্নয়নের মূল স্রোতে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব চেষ্টা বহুলাংশে সফল। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাতে এসেছে নাটকীয় ইতিবাচক পরিবর্তন। আমি মনে করি, আরও সামনে এগোনোর সময় অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি চরের মানুষের নিত্যদিনের জীবন-যাপনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনাটা বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। এখানেই তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি চরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

চরাঞ্চলের মানুষ সাধারণত মূল ভূখণ্ডের মানুষের তুলনায় বেশি দরিদ্র। সিগারেট ও বিড়ির পাশাপাশি ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য যেমন সাদা পাতা, জর্দা, গুল, খৈনি, নস্যি এবং কিমামের ব্যবহার এসব অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দেখা যায়। গ্যাটস ২০১৭ জরিপের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের মধ্যে প্রায় ২১ শতাংশ (অর্থাৎ সোয়া দুই কোটি মানুষ) ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করে থাকেন। পুরুষ তামাকসেবীর উল্লেখযোগ্য অংশ বিড়ি বা সিগারেট সেবন করেন বলে হয়তো তাদের মধ্যে ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবনের অভ্যাস নারীর তুলনায় কম। কিন্তু ওই জরিপ থেকে দেখা যায়, ১৫ বছরের বেশি বয়সী নারীর এক-চতুর্থাংশই এসব ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের ভোক্তা। মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়, ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য ব্যবহারকারীর বড় অংশের গ্রামবাংলায় বসবাস। তার মানে দাঁড়ায়, চরাঞ্চলেও নারী-পুরুষ মিলিয়ে ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য ব্যবহারকারীর অনুপাতটি বড়ই হবে।

সাধারণভাবে তামাক বর্জনীয়। ইসলাম ধর্মেও তামাককে অগ্রহণীয় বলা হয়েছে। তবু চরের দরিদ্র মানুষের ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য সেবন এক ধরনের আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। কারণ, একদিকে দরিদ্র চরবাসী কম দামে কিনতে পেলেও ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের জন্য নিজেদের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করেন। অন্যদিকে তামাক সেবনের ফলে তাদের যে স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হয়, তাও অপূরণীয়। ভেবে দেখুন, তামাকের পেছনে চরের হতদরিদ্র একটি পরিবার যে অর্থ ব্যয় করে, সেটুকু যদি তাদের পক্ষে সঞ্চয় করা সম্ভব হতো, তাহলে অনেকেই তাদের দুরবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। অন্যদিকে তামাক সেবনের ফলে স্বাস্থ্যগত কোনো সংকট হলে চরাঞ্চলে তার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি ব্যয়বহুল। এসব বিবেচনায় আমার মনে হয়, শুধু চর বা হাওরাঞ্চলের মতো প্রত্যন্ত এলাকা নয়, সারাদেশের গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষকে সহজলভ্য ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে বিশেষ নীতি-উদ্যোগ গ্রহণ খুবই জরুরি।

তামাক ও তামাকজাত পণ্য তা সে কম দামি হোক বা বেশি দামি; এগুলোর ব্যবহার কমিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো এসব পণ্যের দাম পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ, কার্যকরভাবে তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়লে এর সহজলভ্যতা কমে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা তাই বলে। আমাদের দেশেও যারা তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে কাজ করছেন তারাও একই কথা বলছেন। চরাঞ্চলসহ দেশের সর্বত্র দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে তামাকের অভিশাপ থেকে বাঁচাতে তারা বিশেষ জোর দিচ্ছেন কম দামি সিগারেট, বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির দিকে। এ ক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। শুধু তাই নয়, ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের ওপর কর বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই কর আহরণের নীতি বাস্তবায়নে একই রকম দৃঢ়তা দেখাতে হবে রাজস্ব বোর্ডকে। আমার বিশ্বাস, তাদের পক্ষে সেটা করা খুবই সম্ভব। পাশাপাশি প্রমিত প্যাকেট/কৌটায় ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্য বাজারজাতসহ অন্যান্য করবহির্ভূত পদক্ষেপও বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, কার্যকরভাবে করারোপের মাধ্যমে এসব পণ্যের দাম বাড়ানো গেলে এর ব্যবহার কমবে ঠিকই, কিন্তু এ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব বাড়বে। করোনাকালে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এই বাড়তি রাজস্ব আয় খুবই দরকারি। তবে এও সত্য, তামাক থেকে সরকারের যে রাজস্ব আয় হয় তার চেয়ে তামাক ব্যবহারজনিত রোগ-বালাইয়ে আক্রান্তদের পেছনে সরকারের অন্তত ১০ গুণ অর্থ ব্যয় হয়। তাই আমি আশা করি, পুরো পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্তই আসবে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী; সংসদ সদস্য

মন্তব্য করুন