হেফাজতে ইসলামের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছি ২০১৩ সাল থেকে। ওই বছর তারা যে ১৩ দফা দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল, তার মূলে ছিল চরম নারীবিদ্বেষ। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নারীরা সবচেয়ে এগিয়ে গেছে। নারীর এ অগ্রগতি তারা মেনে নিতে পারেনি। এর পর থেকে হেফাজত নেতারা তাদের অধীনস্থ কওমি মাদ্রাসাগুলোকে কীভাবে ব্যবহার করে আসছে,তা সবার সামনেই স্পষ্ট। ভাস্কর্য নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলাসহ নানাবিধ সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির একটি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। সে হিসেবে মানুষকে আইনবিরোধী কাজে উস্কে দেওয়া, ভিন্নমতকে আঘাত করে বক্তব্য প্রদান কিংবা মানুষের ওপর হামলা চালানো- এসব স্পষ্টতই রাষ্ট্রবিরোধী কাজ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা দেখছি, তাদের নানাভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। হেফাজতের সাবেক আমির মাওলানা আহমদ শফী ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উপরন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে যথেষ্ট সম্মানিত করা হয়েছে।

আহমদ শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতে ইসলাম বিভক্ত হয়ে যায় সহিংস প্রক্রিয়ায়। তার আগে বিশ্ব ইজতেমাও বিভক্ত করা হয় তাণ্ডবলীলা চালিয়ে। হেফাজতে ইসলাম বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রমাণ করেছে- আইন মেনে চলার মতো বা সুশৃঙ্খল কোনো সংগঠন তারা নয়। দেশ ও জাতির জন্য তারা ক্ষতিকর। হেফাজতের নেতারা তাদের অধীনস্থ কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে হেফাজতে ইসলাম কাজ করছে এবং তাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সরকার যদি মনে করে, হেফাজতকে সন্তুষ্ট করে ক্ষমতায় থাকতে পারবে, তাহলে ভুল করবে। কারণ, ইতোপূর্বে জেএমবি, আনসার-আল-ইসলামসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন ধর্মের নামে যে সহিংসতা চালিয়েছে, হেফাজতে ইসলামও সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ। নাম ভিন্ন হলেও তাদের উদ্দেশ্য এক।

প্রত্যেক ধর্মেই বিভাজন রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো ধর্মের সন্ধান কখনও পাইনি, যেখানে কোনো বিভাজন নেই। ইসলাম ধর্মেও বিভাজন বিদ্যমান। মোটাদাগে আমরা যেমন সুন্নি ও শিয়ার মধ্যে বিভাজন দেখি, তেমনি শুধু সুন্নির মধ্যেও অনেক ভাগ রয়েছে। অনেক মাজহাব রয়েছে। আবার একেকটি মাজহাবের মধ্যেও ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের দিক থেকে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। যারা যে মতকে পছন্দ করে, সেই মতানুসারে কাজ করে। সেখানে কেউ নিজের পছন্দের মতকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। যে কোনো ধর্ম বা মতামতকে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বাধীনতা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে দরকার নিজের বিচার-বুদ্ধি, চিন্তা ও গবেষণা। কিন্তু ভিন্নমতকে আঘাত করে বা কারও ওপর হামলা চালিয়ে নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করার হীন চেষ্টা কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ হতে পারে না। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের সমর্থকরা যে হামলাযজ্ঞ চালিয়েছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুরো বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক এলাকা। সেখানে তারা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলোকে আঘাত করেছে। হেফাজতের তাণ্ডবে ভীতসন্ত্রস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। এ ধরনের হামলার মাধ্যমে হেফাজত এটাই প্রমাণ করছে- তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। সরকার তাদের কাছে জিম্মি। হেফাজতে ইসলামকে অনেকেই ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়াস দেখান। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, হেফাজতে ইসলাম ধর্মীয় কোনো সংগঠন নয়; ধর্মের মোড়কে তারা চরম উচ্ছৃঙ্খল একটি সংগঠন।

করোনা মহামারিকালে যখন দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ; তখনও কওমি মাদ্রাসাগুলো চালু রাখা হয়েছিল। কারণ তারা করোনাকে স্বীকার বা বিশ্বাস করে না। তারা সংগঠনের নাম রেখেছে হেফাজতে ইসলাম। কিন্তু তাদের হেফাজতে যে ছাত্ররা পড়ালেখা করে; তাদের করোনা বা যা-ই হোক; সে বিষয়ে তারা কোনো তোয়াক্কা করে না। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার যে নিদর্শন থাকা দরকার, সেটি তাদের মধ্যে নেই। এ ধরনের মানসিকতার কারণে তারা বিজ্ঞানে বিশ্বাস করে না, আইনে বিশ্বাস করে না বা কোনো নীতিমালায় বিশ্বাস করে না। মানুষ ধর্মকে বিশ্বাস করে মৃত্যুপরবর্তী সৃষ্টিকর্তার কাছে যাতে অনুকম্পা পাওয়া যায়। এই বিশ্বাসীরা জীবদ্দশায় ভালো কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হেফাজত কি সেটি করছে?

ধর্মকে রাজনীতি হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা নতুন নয়। বিশ্বব্যাপী সুদীর্ঘকাল থেকে এ প্রবণতা চলে আসছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও এ ধরনের অবস্থা বিরাজ করছে। এ জন্য তো ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হয়নি। এই ভারত কিন্তু নেহরুর ভারত নয়। ভারত এখন বিদ্বেষমূলক একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধর্মকে কেন্দ্র করে ইউরোপে গঠিত হয়েছিল নাৎসি বাহিনী। পরাজয়ের পর তারা ঠিক করেছিল, ধর্মকে আলাদা রাখবে। কিন্তু এখনও ইউরোপ ও আমেরিকায় সেই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যার ফলে ট্রাম্পের মতো ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প হেরেছেন বটে, কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে কম ভোট পাননি। তার দলও তাকে প্রত্যাখ্যান করেনি। ধর্ম নিয়ে বিশ্বব্যাপী রাজনীতি চলছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো অংশে ব্যতিক্রম নয়। বরং আমাদের দেশ এ ক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে। সতর্ক হওয়া উচিত, ধর্মের রাজনীতির পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সৃষ্টি জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ থেকে। মুক্তিযুদ্ধের আগে আমাদের দেশে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি অনেক বাম দল ছিল। কিন্তু নেতৃত্ব, সাংগঠনিক শক্তি ও জনগণের গ্রহণযোগ্যতা আওয়ামী লীগের মতো অন্য কোনো দলের ছিল না। সে কারণেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও ক্ষমতায় আসা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে; জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে নেতৃত্বের বড় শূন্যতা সৃষ্টির পাশাপাশি ইতিহাসের বিকৃত চর্চা শুরু করা হয়েছে। এর মাঝে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে; তাদের ওপর ব্যাপক হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও বারবার হত্যা করার অপচেষ্টা চলেছে। এখন আওয়ামী লীগ যদি মনে করে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে হবে এবং একটি ধর্মীয় দলকে পক্ষে রাখতে হবে, আর যদি এর ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না নয় এবং সেই দল যদি আশকারা পেয়ে যায়, তাহলে তা হবে বিপত্তির কারণ। হেফাজত এখন দেখাচ্ছে- সরকারেরই প্রয়োজন হেফাজতকে। সরকারি দলের সময় এসেছে হেফাজতকে ছাড় না দিয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখা। তবে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দলটির দুর্বল চেইন অব কমান্ড। ফলে নেতৃত্বের জায়গায় এমন কিছু লোক স্থান করে নিয়েছে, যারা নিরবচ্ছিন্নভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি করে যাচ্ছে। সেখানে তাদের কোনো চেইন অব কমান্ড নেই, জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহিও নেই। আওয়ামী লীগ যদি আবার আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক চর্চা ও সংগঠনের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে দেশ ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ও আমাদের অন্যান্য জাতীয় নেতা এ ব্যাপারে একমত ছিলেন- এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা চলবে না। কিন্তু ১৯৭৮ সালে সেই সুযোগ দেওয়া হয়। সৃষ্টি করা হয় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি। এই আনন্দঘন মুহূর্তে আমাদের অঙ্গীকার করতে হবে, আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, সেই উদ্দেশ্যে ফিরে যাওয়ার। এক্ষেত্রে শুধু হেফাজত নয়; হেফাজতের মতো অন্য যেসব সংগঠন রয়েছে, তাদের অস্তিত্বে যেন নাড়া দিতে পারি।

সমন্বয়ক, নিজেরা করি

মন্তব্য করুন