মুন্সীগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্ব নিরসনে বসা সালিশ বৈঠকে তিনজনের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কিশোর কর্তৃক কিশোর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অহরহ ঘটলেও সালিশ বৈঠকে হত্যার ঘটনা অতীতে আমরা দেখেছি বলে মনে হয় না। পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া কীভাবে তিনজনকে হত্যা করা সম্ভব? কিশোর গ্যাং আজ আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং অশনিসংকেত বহন করে। তাদের কাছে শুধু সহপাঠী, সমবয়সী কিংবা বন্ধুই নিরাপদ নয়, অন্য বয়সের মানুষেরাও অনিরাপদ। মানুষের আচরণের মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্য ও বহুমাত্রিকতা। নিজের আচরণ মানুষ নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তার আচরণ নির্ভর করে বংশগতি, পরিবার, মনো-সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কাঠামোসহ আরও অনেক উপাদানের ওপর। সমাজে প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন যদি সুষ্ঠুভাবে গড়ে না ওঠে এবং যখন এসব প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালনে ব্যর্থ হয়; কিংবা প্রচলিত প্রভাবশালী সামাজিক মূল্যবোধ থেকে অনেকে বিচ্যুত হয়, তখন তার অনিবার্য ফল অপরাধমূলক আচরণ। ভিন্নমত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন রীতিনীতি ও মূল্যবোধের প্রভাব কমে আসে এবং ব্যক্তির মধ্যে অপরাধপ্রবণতা জেগে ওঠে। কিশোর কিংবা বয়স্ক কোনো মানুষ এক বা একাধিক কারণ ও অবস্থার শিকার যখন হয়, তখন তার মধ্যে অপরাধমূলক আচরণের জন্ম হয়।
পরিবর্তনশীল সমাজে পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিতভাবে প্রতিনিয়ত রীতিনীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। আমাদের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অনেকে নতুন দর্শনের সঙ্গে একেবারে মিশে যায় এবং পুরোটাই এক অর্থে গিলে ফেলে। মানব আচরণে চাহিদা বা প্রয়োজন মেটানো সহজাত। চাহিদা পূরণের ব্যাপারে আমাদের আচরণও বিবিধ। কেউ চাহিদা পূরণের জন্য বৈধ পথ বেছে নেয়। কেউ সরকারি সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করে। আবার অনেকে ওপরের দুটি পথের বাইরে অবৈধ পথ বেছে নেয়। আমাদের সমাজে তিন ধরনের চেষ্টাই বিদ্যমান; ব্যক্তি কোনটি বেছে নেবে তা নির্ভর করে তার ব্যক্তিত্বের গঠনের ওপর। যদি গঠন উত্তম হয়, তাহলে কঠোর পরিশ্রমকেই জীবিকার অবলম্বন মনে করবে। কিশোর-কিশোরীদের বেলায় বৈধ ও অবৈধর প্রশ্নটি শতভাগ জড়িত। যদি শৈশব থেকে তারা বৈধতাকেই সবকিছুর চালিকাশক্তি মনে করে তবে বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
শহর কিংবা গ্রামে অনেকেই আতঙ্কে থাকেন- কখন পরিবারের কেউ সামাজিক অপরাধের শিকার হয়। মনে করা হয়, নগর সমাজে জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংহতি ও সমন্বয়ের অভাব গ্রাম সমাজের তুলনায় অনেক কম। আমাদের সনাতন মূল্যবোধগুলো বর্তমান সময়ের কিশোর-কিশোরীদের অনেক আচরণকে সমর্থন করে না। সনাতন মূল্যবোধগুলো অনুশীলন করার মতো পরিবেশের এখন দারুণ অভাব। অনেক কিশোর-কিশোরী নিজে কিংবা তাদের পরিবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হচ্ছে। সন্তানদের অবস্থানগত কারণ কিংবা মা-বাবার নিয়ন্ত্রণহীনতা, যা-ই হোক না কেন তাদের ওপর সনাতন ধ্যানধারণা ভর করতে পারছে না। পাড়ায়-মহল্লায় আজ এক আতঙ্কের নাম কিশোর গ্যাং। বয়সে তারা একেবারে তরুণ এবং কারও কারও বয়স আঠারো বছরেরও কম। তাদের ওপর রয়েছে 'বড় ভাই'দের প্রচ্ছন্ন প্রভাব। এখনই তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কিশোর অপরাধই আমাদের বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতে সময় লাগবে না। বিভিন্ন ঘটনা বিশ্নেষণ করে আমরা লক্ষ্য করি আমাদের মূল্যবোধের বিপর্যয়কে।
পরিবার কাঠামোর ধরনের মধ্যে পরিবর্তন, পারিবারিক বন্ধনে শৈথিল্য এবং অযত্ন, অবহেলা ও অতি যত্নে বেড়ে ওঠা কিশোর-কিশোরীদের পরিবারের বাইরে আনন্দদায়ক পরিবেশের জন্ম দিচ্ছে। শহর সমাজে বসবাসের জায়গা স্বল্পতার কারণেও অনেক কিশোর-কিশোরী বাইরের পরিবেশে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। এর ওপরে রয়েছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব। সামাজিক পরিবর্তনকে কোনোভাবেই আটকানো যাবে না, তবে পরিবর্তনকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের কৌশল আয়ত্ত করাই এখন জরুরি। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে এমন শিক্ষা দিতে হবে, যাতে করে সবাই বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। এটি আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বাস্তবতা হলো বিভিন্ন প্রয়োজনে সন্তান বাইরে যাবে এবং থাকবে। বাইরের বিভিন্ন অবস্থা ও ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচয় হবে কিন্তু সামঞ্জস্য বিধান এবং মোকাবিলা করার কৌশল আগে থেকে আয়ত্ত করার শিক্ষণ থাকতে হবে। আমাদের সচেতনতাই পারে নতুন দর্শন, মূল্যবোধ, ধ্যানধারণা ও রীতিনীতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে। নইলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।
অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
neazahmed_2002@yahoo.com

মন্তব্য করুন