এক সময় আমাদের বৈদেশিক সাহায্যের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হতো। ছোটবেলায় দেখতাম পত্রিকার পাতায় ফলাও করে লেখা হতো অর্থমন্ত্রী পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কত টাকা বেশি এনেছেন। গবেষণার্থে ২০০০ সালে যখন প্রথম বাইরে গেলাম এক বিদেশি বন্ধু বলেছিল- তোমাদের সুবিধাজনক স্টোর যেমন 'সেভেন-ইলেভেন' আছে কি? বলেছিলাম- তোমাদের তুলনায় ঢের বেশি। আমাদের রাস্তার মোড়ে মোড়ে মুদি দোকানগুলো সুবিধাজনক স্টোরের চেয়েও সুবিধাদায়ক আর সেভেন-ইলেভেনগুলো নির্দিষ্ট স্থানে, তাও দু-একটা! আরেকজন বলেছিল- 'কোকা-কোলা পাওয়া যায়?' এখন আর এমন শুনি না! ১৯৯০ সাল থেকে সাহায্যের পরিবর্তে বাংলাদেশ গুরুত্বারোপ করে বাণিজ্য সুবিধার। ফলস্বরূপ- অর্থনীতি গতি পায়। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর সুপারিশ মেলে জাতিসংঘের সংজ্ঞানুসারে 'উন্নয়নশীল' ধাপে উত্তরণের। বলাবাহুল্য, সিদ্ধান্তটি কার্যকর হবে ২০২৬ সাল থেকে। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে 'নিম্ন মধ্যম আয়ের' দেশ হিসেবে উত্তীর্ণ হয় বিশ্বব্যাংকের হিসাবে। বলা দরকার, দুটি সংস্থার শ্রেণিবিভাজনের পদ্ধতিগত পার্থক্য আছে। এই অর্জন একদিকে মর্যাদার, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জের। যাক, উন্নয়নশীল ধাপে সুপারিশের পর গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সিম্পোজিয়ামে স্বনামধন্য বিশ্নেষকরা অর্থনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় নানান পরামর্শ দিচ্ছেন, কেননা পণ্যের শুল্ক্ক হ্রাসসহ অন্যান্য খাতে বিরূপ প্রভাব সম্ভাব্য। আশার কথা হচ্ছে- বিশ্নেষকগণ পথও বাতলে দিচ্ছেন। অনেকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন। তাই বলে হাত-পা গুটিয়ে থাকলে চলবে না। কিছু সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রহিত হওয়ার পাশাপাশি কিছু সুবিধা বাড়ারও সম্ভাবনা আছে। তবে সেগুলো অর্জন করতে হবে। যাক, শিক্ষা বা মানবসম্পদ উন্নয়নে তিন ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে।
প্রথমত, উন্নয়নশীল শ্রেণিতে উত্তরণ ও পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে দক্ষ মানবসম্পদ অত্যাবশ্যক, বিশ্নেষকগণও বলছেন। আমাদের ১৭ বা ১৮ কোটি জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ, যা অনেক দেশের নেই। তরুণ এই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারলে নিঃসন্দেহে অনেক কিছু আপনা-আপনি হবে। কীভাবে? যেমন সবাই 'স্টেম' (এসটিইএম মানে দাঁড়ায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত) শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানি। মূলত, দুটি বড় ইভেন্টে পদ্ধতিটির সূচনা করে। একটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যেহেতু বহু বিশেষজ্ঞের প্রচেষ্টায় আমেরিকা যুদ্ধে জয়ী হয়, সেহেতু তাদের আবিস্কারগুলো সংরক্ষণের নিমিত্তে তৈরি হয় জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (এনএসএফ)। এনএসএফের কর্তাব্যক্তিরাই স্টেম শিক্ষাপদ্ধতিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করেন। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক 'স্পুটনিক' উপগ্রহ উৎক্ষেপণ (১৯৫৭ সাল)। ফলে, যুক্তরাষ্ট্র বেসামাল হয়ে পড়ে। শুরু হয় দুই দেশের 'মহাশূন্য প্রতিযোগিতা'। ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে 'স্পেস অ্যাক্টে'র মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা)। এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকে আজ পর্যন্ত স্টেম শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে নিত্যনতুন প্রযুক্তি এবং অসংখ্য দক্ষ জনবল তৈরি করে। ফলস্বরূপ আমেরিকা মহাশূন্যসহ সব কিছুতেই সোভিয়েতকে টেক্কা দিতে সক্ষম হয়। নাসার বর্তমান কর্মকাণ্ড ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষে ইভেন্ট দুটি ছিল 'বিশাল ধাক্কা'। প্রাযুক্তিক উৎকর্ষ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে আমাদেরও প্রয়োজন এমন 'ধাক্কা'র। দক্ষতা বাড়ানোর সর্বোৎকৃষ্ট হাতিয়ার হতে পারে কার্যকর স্টেম শিক্ষা পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক ভাষার চর্চা। হ্যাঁ, আগে বুঝতে হবে শিক্ষার হাল, দুর্বলতা কী এবং কোথায় উন্নতির দরকার। সনদসর্বস্ব ও ফলাফলমূলক শিক্ষার পরিবর্তে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব
মোকাবিলায় সমক্ষতা অর্জন অপরিহার্য। প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ, নতুবা 'উন্নয়নশীল ফাঁদে' আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, উন্নত দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতি বছর বাংলাদেশিদের শিক্ষাবৃত্তি দেয়। উন্নয়নশীল ধাপে পৌঁছলে বৃত্তির সংখ্যা কমবে। কথিত আছে কিছু দেশ/সংস্থা ইতোমধ্যে বৃত্তির সংখ্যা কমিয়েছে। ফলস্বরূপ, আমরা কতটুকু ক্ষতির সম্মুখীন হবো তা নিশ্চিত না হলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রভাব যে পড়বে তা নিশ্চিত। তবে কৌশলী হলে সুযোগ বাড়তেও পারে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০১১ সালে তৎকালীন কর্মরত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের চীন এবং ২০১২ সালে ব্রাজিলে পাঠানো হলো। উদ্দেশ্য, আমাদের গবেষণার সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়া এবং তাদের নামকরা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার চুক্তি। কৌতূহলী হয়ে দলীয়প্রধানকে জিজ্ঞাসা করি, আচ্ছা তারা মধ্যম আয়ের অর্থনীতি, অস্ট্রেলিয়ার মতো না, তাহলে কেন চুক্তিগুলো করছি। তিনি বললেন, 'দুটি দেশই সামনে বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, তাই এখন থেকে কাজ করা দরকার।' আরও বললেন, 'উন্নত দেশগুলো সামনে অর্থনৈতিক দিক থেকে এদের পেছনে পড়বে, তাই গবেষণা ও শিক্ষা খাতের প্রসারে চুক্তিগুলো কাজে আসবে।' হয়েছেও তাই। ভাবলাম কি দূরদর্শীরে বাবা, আর আমরা কত অদূরদর্শী। আবার কিছু স্বল্পোন্নত/উন্নয়নশীল দেশের বিশ্ববিদ্যালয় উন্নত দেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির দ্বারা শিক্ষা/প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের নাগরিকদের নামমাত্র মূল্যে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করে। আমরা এই সুযোগটাও ভাবতে পারি। কীভাবে? যেমন উন্নত দেশের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচুর খ্যাতিমান বাংলাদেশি গবেষক আছেন। তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে দু'পক্ষের জন্য সম্মানজনক (উইন-উইন পরিস্থিতি) হয় এমন মানসিকতায় এগোনো বাঞ্ছনীয়, দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল অবশ্যম্ভাবী।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীগুলোতে, বিশেষত 'উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার (ওপেন-এক্সেস জার্নাল)', অর্থ ছাড়া প্রকাশনার সুযোগ হ্রাস। স্বল্পোন্নত দেশ বলে বাংলাদেশি গবেষকরা সাময়িকীগুলোতে বিনা পয়সায় প্রবন্ধ ছাপাতে পারেন বা পারতেন। উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তিতে এই প্রথা রহিত হবে। অবশ্য কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অর্থছাড় বন্ধ করেছে। কারণ, ওই প্রকাশকরা বিশ্বব্যাংক প্রণীত শ্রেণিবিভাজনকে অনুসরণ করে। এমতাবস্থায়, আমরা উন্নত দেশের নীতিমালা আমলে নিতে পারি। অর্থাৎ দরকারি গবেষণা সাময়িকীগুলো চিহ্নিত করে প্রকাশকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব- ১. অবাধ প্রবেশাধিকার; ২. বিনা পয়সায় প্রকাশনার সুযোগ।
ওপরের পন্থাগুলো ধর্তব্যে নিলে শিক্ষাক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা অবশ্যই সম্ভব, তাছাড়া প্রস্তুতির সময়ও আছে। তবে কৌশলী হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেমন ভূ-রাজনীতি এবং ভূ-অর্থনীতির দিক থেকে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহির্বিশ্বে দিন দিন বাড়ছে। এটিকে কাজে লাগাতে পটু হওয়া প্রয়োজন। কেননা গরিবের সম্পদ লুণ্ঠনে সবাই সিদ্ধহস্ত। কেউ স্থান করে দেয় না, নিজেকে করে নিতে হয়। প্রযুক্তিতে অগ্রগামী দেশগুলোর সঙ্গে দেনদরবার করতে হবে শিল্প ও মানবসম্পদে বিনিয়োগের। যেসব জায়গায় উন্নতি দরকার (যেমন সহজ ব্যবসা সূচক) সেগুলোতে করিৎকর্মা হতে হবে। মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থির নয়, অর্থাৎ আজ যেটা অপরিবর্তনীয় কাল সেটি পরিবর্তনশীল। সব দেশ নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক, আমাদেরও তাই করতে হবে। সমাজে অকৃতকার্যের গল্প কেউ শোনে না; কিন্তু কৃতকার্যের কথা সবাই শোনে। সুতরাং দৌড়ে পিছিয়ে পড়া যাবে না। দূরদর্শী ও কৌশলী হয়ে ছন্দ ধরে রাখতে হবে। কর্মকাণ্ডে বৈচিত্র্য ও বহুমুখিতা বাঞ্ছনীয়। তার চেয়ে বেশি দরকার মনোজগতের পরিবর্তন।
স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্লানেটারি সায়েন্সেস, কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া

মন্তব্য করুন