বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। মুক্তিযুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে, তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নতুন রাষ্ট্রের তিনটি আদর্শের কথা বলা হতো। এগুলো ছিল যথাক্রমে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচন করে, তখন দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ ছিল না। এই ইশতেহারে বলা হয়েছিল, কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থি কোনো আইন পাস করা হবে না। পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশে এই ধরনের একটি ওয়াদা খুব অস্বাভাবিক ছিল না। যে কোনো সমাজে, যে কোনো ধর্মের 'স্পিরিটের' বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কোনো রকম পদক্ষেপ গ্রহণ খুবই কঠিন। কঠিন বলাও হয়তো যথেষ্ট হবে না। বাস্তবতা হচ্ছে এ রকম কিছু করা অসম্ভব।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সেক্যুলার দেশে নির্বাচনের সময় কিছু ধর্মীয় ইস্যু যেগুলো আপাতভাবে সুস্থ মনে হয়, সেগুলো বেশ গুরুত্ব অর্জন করে। যেমন- গর্ভপাত বিরতীকরণ। এ ব্যাপারে মার্কিন জনমত তীব্রভাবে বিভক্ত। তাদের একদল 'প্রো-লাইফ' হিসেবে পরিচিত। যারা মাতৃগর্ভে আসা ভ্রূণ হত্যার পক্ষে, তাদের চিহ্নিত করা হয় 'অ্যান্টি লাইফ' বা জীবনবিরোধী হিসেবে। এই বিতর্কটি গভীর দার্শনিকতাপূর্ণ। বলা হয়, তুমি যে জীবন সৃষ্টি করতে পারোনি, সেটি নাশ করার অধিকার তোমার নেই। অন্যদিকে যারা ভ্রূণ হত্যার অধিকার চায় তারা যুক্তি দেখায়, এটা আমার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার। এ ছাড়া আরেকটি যুক্তি আছে, সেটি হলো- গর্ভে আসা সন্তানটি যদি মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এমন গর্ভধারণের অবসান কামনা করা অযৌক্তিক নয়। যখন বিষয়টি মায়ের জীবন সংকটের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, তখন অবশ্য উভয়পক্ষই এই বিতর্ক থেকে বিরত থাকে। যারা গর্ভধারণে বিরতি ঘটাতে চান, তারা মার্কিন সমাজে মুক্তচিন্তা ও নারী অধিকার প্রবক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। অন্যদিকে যারা ভ্রূণ হত্যার বিরোধী, তারা রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, অতি উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজেও রাজনীতিতে ধর্মের সূক্ষ্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক প্রবেশ করে। আমাদের মতো অনুন্নত-অনগ্রসর সমাজে ধর্মের বিষয়গুলো রাজনীতিতে বেশ কিছুটা প্রভাব বিস্তার করবে, তা অস্বাভাবিক নয়।
ভারতের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমিলা থাপার তার 'সেক্যুলারিজম অ্যান্ড হিস্ট্রি' প্রবন্ধে আলোচ্য বিষয়টির সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ দিকগুলো নিয়ে চমৎকার বিশ্নেষণ করেছেন। এই প্রবন্ধটি তিনি পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ভাষণ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। চিন্তার জগতে রমিলা থাপার অত্যন্ত প্রগতিশীল মানুষ। তিনি ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের ওপর একজন নামকরা বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিককালে (নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে) দাবি করা হয়েছে, ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে। এই সমাপ্তি সম্ভব হয়েছে সমাজতন্ত্রের ওপর বিশ্ব পুঁজিবাদের বিজয়ের ফলে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তার 'দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান' গ্রন্থে এই যুক্তি হাজির করেছেন। তিনি বলতে চান, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বাজার অর্থনীতি ও পুঁজিবাদ ছাড়া অন্য কোনো আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এই পৃথিবীতে আর আসবে না। রমিলা থাপার ফুকুইয়ামাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, গত কয়েক বছরেই আমার দেখেছি এবং দেখে চলছি যে, বিভিন্ন মতাদর্শ নাটকীয়ভাবে একটি অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে এবং মনে হচ্ছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মতো আদর্শগত বিতর্কের সূচনা হয়েছে। এই বিতর্ক ইতিহাসের অবসান না ঘটিয়ে বরং ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে। যুগোস্লাভিয়ায় জাতিগত দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছে (নব্বইয়ের দশকে) এবং এসব দ্বন্দ্বের আড়ালে রয়েছে বর্ণবাদ এবং জাতীয়তার মতো বিষয়গুলো। দেখা যাচ্ছে, রাজনীতির মধ্যে ধর্ম চুইয়ে চুইয়ে প্রবেশ করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিশ্ব পুঁজিবাদের ভেতরে দৃশ্যমান, যেমন দৃশ্যমান আমাদের এই উপমহাদেশে। রমিলা থাপারের এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিধারী ভারত ধর্মান্ধতার মধ্যে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে, যা আমরা আজ বিজেপির হিন্দুত্ববাদে লক্ষ্য করি।
বুদ্ধিভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতে ইতিহাসের কালবিভাজন করা হয় প্রাক-ঔপনিবেশিক, ঔপনিবেশিক এবং উত্তর ঔপনিবেশিক হিসেবে। শেষের দুটি খুবই পরিচিত এবং নানামুখী বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় আলোচিত হয়। কিন্তু প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারত সম্পর্কে অনেকেরই তেমন কোনো পরিচয় নেই। এ সত্ত্বেও প্রাক-আধুনিক ভারতীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে কিছু সাধারণীকরণ করা হয়। প্রায়ই এর ভিত্তি হচ্ছে, যাকে ঐতিহ্য হিসেবে মনে করা হয়। খুব সাদামাটাভাবে মনে করা হয়, প্রাচীন মানেই তো আধুনিক বৈশিষ্ট্যের বিপরীত। ঔপনিবেশিক আমলে যে ইতিহাস রচনা করা হয়েছে, সেখানে ঐতিহ্য, সমাজ অথবা সংস্কৃতি সম্পর্কে বলা হয় ঔপনিবেশিক মাপকাঠির ভিত্তিতে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে জানার তেমন কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। কিছু ইতিহাসবিদ আছেন, তারা মনে করেন, ইতিহাসের ব্যাখ্যায় এগুলো সম্পর্কে পরিচিত হওয়ার দরকার নেই। যদি ইতিহাসের ব্যাখ্যায় সাংস্কৃতিক ধারণাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হয়, তাহলে এগুলোকে দেখতে হবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট থেকে।
রমিলা থাপার মনে করেন, যে সমাজে এখন অতীত থেকে বেশকিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের অবশেষ টিকে আছে, সেখানে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের ইতিহাস বিষয়ে বিবেচনা রোধের উদাসীনতা একটি তত্ত্ব থেকে এসেছে। এই তত্ত্বটি ইতিহাসবিদদের জন্য খুবই গোলমেলে। যেমন- সব ঐতিহাসিক মুহূর্ত একটি অন্যটির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, দৈবক্রমে ঘটে যাওয়া বিষয়ও হঠাৎ আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ইতিহাসকে অস্বীকার করা হয়। শুধু মনে করা হয় ইতিহাসের মুহূর্তগুলো উপনিবেশ-উত্তর অবস্থা থেকে এসেছে এবং এগুলোকে প্রাক-ঔপনিবেশিক অথবা ঔপনিবেশিক কালের মিথস্ট্ক্রিয়া হিসেবে দেখা হবে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু একজন ইতিহাসবিদের দৃষ্টি থেকে এটা অগ্রহণযোগ্য।
আমরা এখন নিজেদের সম্পর্কে এবং আমাদের অতীত সম্পর্কে ভাঙা ভাঙা দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত। ভাঙনের এই দৃষ্টি এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমাদের অতীত সম্পর্কে ব্যাখ্যা থেকে। আমরা আশান্বিত হয়ে দেখেছিলাম যে, উপনিবেশ অবসানের পর একটি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটেছে। এর অর্থ এই নয় যে, শাসকরা যা বলবে সেটিই সবকিছুকে প্রতিনিধিত্ব করে। সমাজে বিভিন্ন দল থাকে বা একে গোষ্ঠীও বলা যায়। এদের কারও কারও মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষও থাকে। বর্তমান সমাজে নানা ভাঙন এসেছে নানাভাবে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান হলো ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। আমরা মনে করেছিলাম ইংরেজ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার সময় এর 'কবর' রচিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাত-পাতের ব্যাপার এবং আঞ্চলিক গোঁয়ার্তুমি। কেউ কেউ বলবেন জাতি-রাষ্ট্রে এসব হয়। যেদিন জাতি-রাষ্ট্র থাকবে না সেদিন এসবও থাকবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে এটা ঘটবে এবং জাতি-রাষ্ট্রের পরিবর্তে কী আসবে, তা পরিস্কার নয়। এই মুহূর্তে জাতি দৃশ্যমান এবং একটি ক্রিয়াশীল সত্তা আমাদের বাস্তব কাজ হওয়া উচিত। এমন সব পদক্ষেপ নেওয়া- যার ফলে জাতির কল্যাণ হয় এবং সবার অভিন্ন মঙ্গলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
গত কয়েক বছর পাশ্চাত্যে জনতুষ্টিবাদের উদ্ভবের ফলে গণতন্ত্র খুবই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের মতো দেশে অতি দক্ষিণপন্থি দল শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আমরা সেক্যুলারিজমের বাংলা করতে গিয়ে কখনও বলি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, আবার কখনও বলি ইহজাগতিকতাবাদ। রাজনৈতিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে সাম্প্রদায়িকতার নিন্দা জানাতে আমরা উচ্চকণ্ঠ। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রদায়বোধের পার্থক্য সম্পর্কে চিন্তা করি না।
আজ থেকে ৫০ বছর আগে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের সময় অনেকে বলেছিলেন, দ্বিজাতি তত্ত্বের মৃত্যু ঘটেছে। তাহলে এখন সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে এত উদ্বেগ কেন প্রকাশ করা হচ্ছে। এটা কি নিছক রাজনৈতিক কারণে নাকি মানবকল্যাণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে কারণে? দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এসব আদর্শগত, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যগত বিষয় নিয়ে এদেশের কোনো বুদ্ধিজীবী প্রশ্নটির গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন না! রমিলা থাপার আরও অনেক মূল্যবান আলোচনা করেছেন, যেগুলো বর্তমান আলোচনায় যোগ করা হয়নি। ভবিষ্যতে সে প্রশ্নগুলো তুলে ধরার ইচ্ছা রইল।
অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

মন্তব্য করুন