করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির এ সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হওয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। দিবসটি এমন সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্যগত বিপর্যয় ঘটেছে। গত বছরের কথা বাদ দিলে এ চিত্র পৃথিবীর জন্য এক অভূতপূর্ব ঘটনা। তবে গত বছর করোনাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশা স্পষ্ট করে দেখিয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়েছে সামান্যই। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা আমরা বছরজুড়েই দেখে আসছি। সাম্প্রতিক সময়ে করোনার প্রকোপ বাড়ার কারণে হাসপাতালগুলোতে 'ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই' অবস্থা। ফলে কেবল চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগই নয়, বরং কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরেও অ্যাম্বুলেন্সেই রোগীর দুঃখজনক মৃত্যুদৃশ্য সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে আমাদের সামনে এসেছে। চলমান এই মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্র হয়েছে আইসিইউ ও অক্সিজেনের অভাবে। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রথম দফার করোনা রোগীর তুলনায় এবারের রোগীরা অনেক বেশি জটিল বলে সামান্যতেই প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় এবার রোগীদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র তথা আইসিইউ ও অক্সিজেন বেশি লাগছে। স্বাভাবিকভাবেই হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সংকট শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩১ জেলার মধ্যে অর্ধেকেরই আইসিইউ নেই। আমরা জানি, ১০ মাস আগে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদিনেও জেলা পর্যায়ে কেন আইসিইউ ইউনিট তৈরি হয়নি? আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এমনকি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের ব্যাপারে মনোযোগ না বাড়িয়ে চিকিৎসা-বহির্ভূত খাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মনোযোগ বেশি বলে এতদিন ধরে যে অভিযোগ আমরা শুনে আসছি, এটাই কি তার প্রমাণ নয়। গত বছরই স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়; করোনা মোকাবিলায় মাস্ক, পিপিইসহ সুরক্ষা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তদন্তক্রমে এর সত্যতাও পাওয়া যায়। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকার ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। মঙ্গলবার সাত হাজারের অধিক নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হওয়া এবং এক দিনে ৬৬ জনের মৃত্যুর আমাদের উদ্বিগ্ন করছে। একটি তথ্য আমাদের আরও বেশি হতাশ করছে, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধিদের সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রতিদিন পাঁচ হাজার লোক আক্রান্ত হলে এবং সবাই হাসপাতালে এলে সারাদেশকে হাসপাতালে রূপান্তর করলেও রোগীর জায়গা দিতে পারব না। আমাদের নানা সীমাবদ্ধতার বিষয়টি হয়তো অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি কমানোর মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের সংকট সমাধান করা অসম্ভব হবে না। মনে রাখতে হবে- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার। এই প্রেক্ষাপটে সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতি তাগিদ দিয়েই এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য 'সবার জন্য সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত বিশ্ব'। করোনা-দুর্যোগের এ সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলেছে। বাংলাদেশে এ বৈষম্য আরও প্রকট। দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা যেমন বাড়ানো প্রয়োজন, তেমনি সেখানে সহজেই যাতে সবাই সেবা পেতে পারে তা-ও দেখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, একই সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ব্যক্তির দায়ও কম নয়। আমরা জানি, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। এ প্রতিরোধের অংশ হিসেবেই করোনার ক্ষেত্রে মাস্ক পরিধান করাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এমন সব ক্ষেত্রেই ব্যক্তি সচেতন থাকলে যে কোনো ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তবে জাতীয়ভাবে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের যে রোগ রয়েছে, তা আগে সারাতে হবে। সসীম সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের সফলতা।

মন্তব্য করুন