সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ শুরু করেছিল তার চার মূল মন্ত্র- জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্র নিয়ে। এই চার আদর্শ বুকে নিয়ে সদ্য স্বাধীন রক্তমাখা বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজে নামলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি গড়ে তুলতে শুরু করলেন মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংস হওয়া রাস্তাঘাট-পুল-কালভার্ট; দিলেন পবিত্র সংবিধান; করলেন পর্যাপ্ত আইনি সংস্কার। এসবের মধ্যেও থেমে থাকল না পরাজিত শক্তির চক্রান্ত। চুক্তিবদ্ধ খাদ্য সরবরাহ করল না আমেরিকা, ঘটল দুর্ভিক্ষ। আমেরিকা সৃষ্ট দুর্ভিক্ষকে উপলক্ষ বানিয়ে সৃষ্টি করা হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা। হত্যা করা হলো জাতীয় চার নেতাসহ জাতির পিতার পুরো পরিবার। কপাল গুণে বেঁচে গেলেন শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা। বাঙালির ভাগ্যের চাকা উল্টো দিকে ঘুরে গেল। জিয়াউর রহমানের মতো আদর্শহীন শাসকের হাতে বাংলাদেশ চলল বিপথে।
আদর্শ ও তা থেকে উৎসারিত নীতি ছাড়া কেউ কোনো দিন কিছু অর্জন করতে পারেনি। এ কথার প্রমাণ আদর্শহীন আরেক শাসক খালেদা জিয়ার দশ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্ব। তার শাসনামলে বাংলাদেশের চিহ্নিত শত্রুরা জাতীয় পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে রাজপথ; দুর্নীতিতে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। তার পুত্রদ্বয়ের পাচার করা দুর্নীতির অর্থ ফিরিয়ে এনেছে বাংলাদেশ। নিজেদের ভান্ডার পূর্ণ হলেও সভ্যতার শত্রু মৌলবাদ আর জঙ্গিবাদ ছাড়া বাংলাদেশকে তারা আর কিছুই দিতে পারেনি। এমন একটা উদাহরণ নেই যা দেখিয়ে জিয়ার অনুসারীরা বলতে পারে যে এটা তারা করেছে। বস্তুত নীতি, আদর্শবিবর্জিত রাজনীতি কখনোই পারে না দেশের জন্য, মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে।
বঙ্গবন্ধুকে তার পরিবার ও সারথিদেরসহ হত্যা করার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হাতে পায় তার সুযোগ্য কন্যার নেতৃত্বাধীন তারই সৃষ্ট দল আওয়ামী লীগ। সামরিক শাসক ও খালেদা জিয়ার দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পশ্চিমা স্বার্থে যে কৃষি ভর্তুকি বন্ধ করে দিয়েছিল তা আবার চালু করা হয়। যে সারের জন্য খালেদা জিয়ার সরকার গুলি করে কৃষক হত্যা করেছিল সেই সার কৃষকের জন্য সহজলভ্য করে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারই নেতৃত্বে মতিয়া চৌধুরীর কৃষি মন্ত্রণালয় তখন বাংলাদেশে কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছিল। বাম্পার ফলন হয়েছিল সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে। বাংলাদেশ পৌঁছে গিয়েছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে। প্রথমবারের মতো সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য চালু করা হয়েছিল সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্প। বঙ্গবন্ধুর গরিবদের মুখে হাসি ফুটতে শুরু করেছিল। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম নতুন করে শুরু করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শাহ কিবরিয়া জাতিকে উপহার দেন অর্থনৈতিক দিকদর্শন, পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা।
২০০১-০৬ সালের অরাজকতার সরকারের নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। সে সময়ে হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক দুর্নীতিতে দেশ সয়লাব করে গণবিক্ষোভের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা ছাড়েন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পূর্ণ শক্তিতে রাজনীতিতে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু তনয়া। একাধারে শুরু করেন দুই সংগ্রাম- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আর অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার, একাত্তরের ঘাতকদের বিচার নিশ্চিত করে তিনি প্রমাণ করেন বাঙালির দেশে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়; যত বড় দেশের সমর্থন নিয়ে যত বড় শক্তিশালী হোক না কেন সকল অপরাধীকেই তার উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে। অন্যদিকে চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন।
শেখ হাসিনার শাসনামলে লাফিয়ে লাফিয়ে প্রবৃদ্ধির হার বাড়তে শুরু করে। বাঙালির স্বপ্নের বড় বড় অবকাঠামো তিনি গড়তে শুরু করেন সকল বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে। বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ; উদ্বৃত্ত খাদ্য বিদেশেও রপ্তানি করে। সরকারের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে গেছে গ্রাম পর্যায়ে। বাজেটের ২০ শতাংশের বেশি এখন ব্যয় হয় সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পে। বছর বছর বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে। বাংলাদেশ এখন আর দরিদ্র নয়, মধ্যম আয়ের দেশ। শেখ হাসিনা স্বপ্ন দেখিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উচ্চমধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ।


 

এই সড়কই বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ। এ পথেই বাঙালির রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। তবে পথটা মসৃণ নয়। এখানে এখনও রয়েছে অনেক খানখন্দ। সেগুলো উপযুক্ত প্রযুক্তি আর যন্ত্রাংশ দিয়ে মেরামত ও পরিচর্যা করে চলতে হয়। মেরামত করতে করতেই এগিয়ে যেতে হয়। কারও জন্য, কখনোই প্রগতির পথ কণ্টকমুক্ত নয়। বাঙালির মহাসড়কে এখন উপযুক্ত প্রযুক্তি আর যন্ত্রাংশ দিয়ে মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে তিন সমস্যা- মৌলবাদ, দুর্নীতি এবং আওয়ামী লীগের বিপক্ষে বাংলাদেশপন্থি যোগ্য গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল।
পাকিস্তানপন্থি ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতি পেট্রো ডলার আর পশ্চিমা অস্ত্রে হূষ্টপুষ্ট হয়ে এখানে নতুন করে ডালপালা ছড়িয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে। এখনও চলছে তার বিস্তার। তারা বর্তমান বাংলাদেশে এতটাই শক্তিশালী যে তারা স্থান করে নিয়েছে পাঠ্যপুস্তকে, সংস্কৃতিতে। শেখ হাসিনার দেওয়া তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা তারা ব্যবহার করছে মৌলবাদ বিস্তারে আর প্রগতিবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডায়। তাদের রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়। দেরি হলে বাংলাদেশ আবার ছিটকে পড়বে তার পথ থেকে। হবে আবারও জীবন, সময় ও সম্পদের অপচয়।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়। দুর্নীতি সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে যথেষ্ট। বাংলাদেশ এখন দ্রুত অর্থনীতি বর্ধনশীল দেশ। দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবিধা সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না সকল বাংলাদেশির মধ্যে। দুর্নীতিবাজদের হাতে সম্পদের বেশির ভাগ থেকে যাচ্ছে। উপযুক্ত আইন ও নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্র পারছে না সম্পদের সুষম বণ্টন করতে। আইন ও নীতি প্রণেতা এবং বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিযুক্ত সরকারি কর্মচারী প্রায় সকলেই বিভিন্ন মাত্রার দুর্নীতিবাজ। তাদের সহায়তায় একশ্রেণির ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের করের পয়সা নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে ফেলছে। বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে সকল নীতিবান নাগরিকের প্রত্যাশা- এই দুষ্টচক্র ভেঙে দিন। দেশে এখনও অনেক সৎ ও যোগ্য মানুষ আছেন। তাদের রাজনীতিতে এবং সরকারে উপযুক্ত স্থানে বসিয়ে দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা দরকার। এ কাজে ব্যর্থ হলে ভেঙে পড়বে বাঙালির সোনার বাংলার স্বপ্ন।
৫০ বছরের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের বিপরীতে সংবিধানের চার মূলনীতি ধারণ করা যোগ্য রাজনৈতিক দলের অভাব। গণতন্ত্র তখনই পূর্ণ শক্তিতে বিকাশ লাভ করতে পারে, যখন সেখানে প্রকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জনকল্যাণ ইস্যুতে সত্যিকারের বিতর্কের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় এবং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া প্রকৃত বাংলাদেশপন্থি দল হচ্ছে সিপিবি, ন্যাপ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরাম ও বাসদ। এ ছাড়াও হয়তো দু-একটি দল আছে। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক দল নয়, সুবিধাবাদীদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সৃষ্ট এক ধরনের ক্লাব। তাদের কোনো রাজনৈতিক দর্শন নেই।
আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য বাংলাদেশপন্থি দলগুলো বর্তমান পৃথিবীর বাস্তবতায় রাজনৈতিক দর্শন এবং কৌশল খুঁজে পাচ্ছে না বলে তারা দিকভ্রান্তের মতো আচরণ করছে। তাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের ওপর, অন্যরা বিএনপির ওপর পরজীবীর মতো নামকাওয়াস্তে বেঁচে আছে। তাদের বেশিরভাগ মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের পুষ্ট করছে। এই দলগুলোর নেতারা ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়ে এতটাই নিমিজ্জিত যে, বর্তমান পৃথিবীর আলোকে তারা ভবিষ্যৎ রাজনীতি দেখতে পাচ্ছে না। নিজেরা সংগঠিত হতে এবং জনগণকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। তারা নিজেদের সংস্কার করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের প্রকৃত প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সে সুযোগ এখনও তাদের রয়েছে। তবে এই লেখক তাদের নিয়ে আশাবাদী নয়।
বাংলাদেশে অন্তত একটা নতুন রাজনৈতিক দল দরকার যে দলের আদর্শ হবে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি। যারা জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে স্লোগান দিতে দ্বিধা করবে না। যারা বিজ্ঞানমনস্ক হবে; জগৎ সংসারের রাজনীতি, অর্থনীতির খোঁজ-খবর রাখবে, জ্ঞান ও মেধার সমন্বয়ে নতুন দিনের নতুন ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান নিয়ে জনগণের কাছে যাবে। দলটিকে হতে হবে বিচক্ষণ, সাহসী, বাস্তবতাবাদী।
এমন একটা দল তৈরি হলে বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা এনে দেওয়া দল আওয়ামী লীগ যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী পাবে। যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে করতে এগিয়ে যাবে আওয়ামী লীগ। দ্বন্দ্ব ছাড়া বিকাশ হয় না। এমন একটি দল গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ নিজে থেকেই উদ্যোগী হতে পারে। নতুন একটি দল গঠনে আওয়ামী লীগ ভূমিকা রাখলে বাংলাদেশের প্রয়োজনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার গৌরব অর্জন করবে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি। সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক পরিবেশের দিকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট

মন্তব্য করুন