করোনা সংক্রমণের নতুন করে ক্রম ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে আমরা ফের ঝুঁকির মুখে পড়েছি। এ অবস্থায় টিকাদান কর্মসূচির প্রথম ডোজ বন্ধ করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা রদ করে এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আজ থেকে শুরু হবে টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রদান কার্যক্রম। টিকা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার আপাতত কোনো কারণ দেখছি না। তবে এ ব্যাপারে আমাদের বহুমুখী উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। টিকার বিকল্প উৎস সন্ধানের যে প্রচেষ্টা চলছে, এর গতিশীলতার পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি যাতে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়ে, সেদিকে নজর আরও নিবিড় করতে হবে। করোনা সংক্রমণ রোধে আতঙ্ক নয়, আমাদের সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।

সমগ্র জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে হলে একটি উৎস থেকে প্রাপ্ত টিকা দিয়ে তা সম্ভব নয়। আমাদের অন্য উৎসের সন্ধানে জোরদার কার্যক্রম চালাতে হবে সংগত কারণেই। একটি স্বস্তির বার্তা হলো, দেশে টিকা উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। তবে আমরা যদি টিকা উৎপাদন করতে সফল হইও, তা দিয়ে কিন্তু সমগ্র জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা যাবে না। আমরা উৎপাদন করতে পারলে সমস্যার কিছুটা লাঘব হবে। তবে যে উৎসের সঙ্গে টিকার ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে, সেসব ক্ষেত্র থেকে চুক্তি অনুযায়ী টিকা পেলেও আমাদের সবাইকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে না। কোভ্যাক্স থেকেও আমাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডোজ টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে এবং এর মধ্যে একটি বড় চালান আসারও কথা ছিল। কিন্তু এই চালান প্রাপ্তির প্রক্রিয়া একটু প্রলম্বিত হবে মনে হচ্ছে। কোভ্যাক্স শতকরা ২০ ভাগ টিকা আগামী দু'বছরব্যাপী আমাদের দেওয়ার কথা। কিন্তু আমরা যদি দ্রুত সমগ্র জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় এনে গোষ্ঠীবদ্ধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তাহলে অবশ্যই অন্যান্য উৎস থেকে টিকা আনার ব্যবস্থা করতে হবে। নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতিক্রমে যদি নিজেরা টিকা উৎপাদন করতে চাইলেও ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জরুরি। টিকা উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল প্রয়োজন। শুধু কাঁচামাল পেলেই টিকা উৎপাদনে যাওয়া যাবে না। দরকার প্রযুক্তি সহায়তা। মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাসের টিকা যত তাড়াতাড়ি আবিস্কার সম্ভব হয়েছে, আর কোনো টিকার ক্ষেত্রে এমনটি হয়নি। এ ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রেখেছে পারস্পরিক সহযোগিতা।

মেধাস্বত্ব আইন শিথিল করে কোনো কোনো দেশের প্রতিষ্ঠানকে টিকা উৎপাদনের যে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, এর বিস্তৃতকরণ দরকার। সংশ্নিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার সিদ্ধান্ত- ২০২১ সাল পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী যেসব ওষুধ রয়েছে, সেসবের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব আইন শিথিল করা যাবে। টিকা তো জীবন রক্ষাকারী ওষুধই। তাই এ ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য বলে মনে করি। আমাদের উপযুক্ত মানের কারখানা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী পরীক্ষাগার গড়ে তোলা ইত্যাদি টিকা উৎপাদনের জন্য জরুরি অনুষঙ্গ। করোনার টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যা করেছে, সবই দ্রুতগতিতে করতে সক্ষম হয়েছে। টিকা আনার জন্য অগ্রিম অর্থ দিতে দিয়েছে। চীনে যখন জিনোম সিকোয়েন্সটা পাওয়া গেল, তখনই তারা কারখানা তৈরি শুরু করল। বাংলাদেশও যদি টিকা উৎপাদনে সংশ্নিষ্ট সব মহলের সহায়তা পায়, তাহলে লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। আমরা নিশ্চয়ই টিকা উৎপাদন করতে সক্ষম। সরকারি ওষুধ কোম্পানিসহ বেসরকারি বেশ কয়েকটি কোম্পানি রয়েছে যারা টিকা উৎপাদন করতে পারবে। আমাদের ওষুধ শিল্পের সাফল্য-সামর্থ্য কম নয়।

সংক্রমণ বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। ঢেউটা যেন খাড়া ওপরে উঠছে। এ অবস্থায় টিকা অত্যন্ত জরুরি। তবে টিকাপ্রাপ্তি কিংবা গ্রহণ কোনোটাই চূড়ান্ত সমাধান নয়। এ জন্য সর্বাগ্রে দরকার স্বাস্থ্যবিধির যথাযথ অনুসরণ। স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো রকম শৈথিল্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে। নিজের সুরক্ষার দায়টা ব্যক্তির। নিজে সুরক্ষিত থাকলে অন্যকেও সুরক্ষিত রাখা যাবে। সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতেই হবে। এখন যে ঢেউ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এর চূড়ান্ত পরিমাপ করতে পারব আমরা দু'সপ্তাহ পর। মৃত্যুঝুঁকি সাধারণত সংক্রমণের তিন সপ্তাহ পর্যন্ত থেকে যায়। সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি তা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার বিরূপ ফল। একজন টিকাগ্রহীতার শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতে নূ্যনতম ১৪ দিন সময় প্রয়োজন। কারও কারও ক্ষেত্রে এর বেশিও লাগতে পারে। তাই টিকা নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সামনে আমাদের জন্য আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এই বার্তা ভীতি সৃষ্টির জন্য নয়; সতর্ক হওয়ার জন্য। যারা করোনা রোগী হিসেবে শনাক্ত হবেন, তাদের 'ফিল্ড হাসপাতাল'-এর মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া জরুরি। এর ফলে রোগী জটিল পরিস্থিতিতে পড়ার আগেই রোগমুক্তির পথ পাবেন এবং একই সঙ্গে ভাইরাস বহনকারীর মাধ্যমে ছড়ানোর পথটাও সংকুচিত হবে। চাপ কমবে হাসপাতালের ওপরে। 'ফিল্ড হাসপাতাল' গড়ে তোলা খুব কঠিন কিছু নয়। এ জন্য যেসব উপকরণ দরকার তাও জোগাড় করা দুরূহ নয়। করোনা সংক্রমণের চিত্রটা সামাজিক যুদ্ধাবস্থার মতোই। আমাদের সেনাবাহিনীসহ অন্য বাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘের শান্তি মিশনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ফিল্ড হাসপাতালের ব্যাপারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে। যদি আক্রান্ত ব্যক্তি ফিল্ড হাসপাতালে আইসোলেশনে থাকেন, তাহলে ভাইরাস ছড়ানোর পথটা অনেকটাই রুদ্ধ হবে। এ ব্যবস্থাটা হলো জানা সূত্র থেকে সংক্রমণ এড়ানোর একটা যথাযথ পথ।

যারা সংক্রমণের ব্যাপারে জ্ঞাত হতে পারছেন না, অর্থাৎ অজানা থেকে যাচ্ছেন, তাদের নিয়ে আশঙ্কা বেশি। তাদের অসাবধানতা-অসচেনতা-অসতর্কতা ঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব-পরিস্থিতি করোনার কারণে নাজুক। আমরাও এর বাইরে নই। আমরা কিন্তু নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি থেকে ফের অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়লাম। এ ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে কমবেশি এখন সবাই জানলেও নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে অনেকের অনাগ্রহ-উদাসীনতা এখনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যক্তি নিজেই কিন্তু এ ক্ষেত্রে মূল নিয়ামক শক্তি। মানুষকে আমরা সচেতন-সতর্ক করার সব কার্যক্রম জোরদারভাবে অব্যাহত রাখব। কিন্তু সবই করতে হবে সম্পূর্ণ মানবিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে। 'সামাজিক ভ্যাকসিন' হিসেবে বিবেচিত মাস্ক ব্যবহারের ব্যাপারে সবার সজাগ থাকতেই হবে।

সংক্রমণের 'হট স্পট'গুলো বিশেষ করে নজরদারিতে আনার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের ব্যাপারে ভাবতে হবে। শুধু সরকারের নয়; সমাজের বিত্তবানদেরও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত। মানবিক সংকট মোকাবিলায় যূথবদ্ধ প্রচেষ্টার অনেক দৃষ্টান্ত দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছিল। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাতে সহজ প্রক্রিয়ায় টিকার আওতায় আসতে পারে, এখন সেই প্রচেষ্টা আরও নিবিড় করা অত্যন্ত জরুরি। টিকার আওতায় যত বেশি মানুষকে আনা যাবে এবং সবাই যদি নিয়ম মানেন, তাহলে ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ দৃষ্টান্ত রয়েছে। মৃত্যুহার তারা কীভাবে নিম্নগামী করতে পেরেছে; সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে অনেক সাধারণ মানুষও এখন তা জানেন। কিন্তু জানাই শেষ কথা নয়; মানাটাই মূলকথা।

আমাদের টিকা গ্রহণের বর্তমানের গতির সঙ্গে সংগতি রেখে হাতে প্রয়োজনমাফিক টিকা আছে। কিন্তু টিকাদানের গতিটা আরও বাড়াতে হবে এবং তখনই টিকার চাহিদা বাড়বে। আশা করছি, অঙ্গীকারবদ্ধ সূত্রগুলো থেকে টিকা পেয়ে যাব। কিন্তু নতুন নতুন উৎস থেকে টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে যাতে অগ্রগতি হয়, এখন সেটাই জরুরি কাজ। ভবিষ্যতে টিকা কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে- এই শঙ্কা যেহেতু রয়েছে, সেহেতু টিকা সংগ্রহ ও দেশে উৎপাদন এই উভয় প্রক্রিয়াই সময়ক্ষেপণ না করে গতিশীল করতে হবে। প্রথম ডোজ বন্ধ করে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার নজির বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই রয়েছে। প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আবার কার্যক্রম সেভাবে চালানো হয়। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংক্রমণের ঢেউ নিম্নগামী না হওয়া পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কঠোর রাখা প্রয়োজন। তবে মানুষকে মানিয়েই তা করতে হবে। এ জন্য সরকারসহ সামাজিক শক্তি, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এ ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রান্তিকদের দিকে সহায়তার হাত বাড়াতে হবে সবার। এ কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাক সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আর্থসামাজিক অভিঘাত ঠেকাতে সুবিন্যস্ত কর্মপরিকল্পনা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সমন্বয়-ভারসাম্যতার বিষয়গুলোও আমলে রাখতে হবে। আমাদের জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। তার পরও গত বছরের চেয়ে এর পরিসর অনেক বেড়েছে। আইসিইউ, অক্সিজেন সরবরাহও বেড়েছে। অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমতি আমরা দিয়েছি। এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার আওতা আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।

রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর

মন্তব্য করুন