প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি উদ্ভিদ এবং প্রাণীর রয়েছে সমান ভূমিকা। সকলেই একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমে গড়ে তোলে বাস্তুতন্ত্র। এরই এক ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী হচ্ছে মৌমাছি। মৌমাছিরা ফুলের পরাগায়নে সহায়তা করে বনজ, ফলদ এবং কৃষিজ ফসলের উৎপাদন ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম। তাই মৌমাছিকে পরিবেশের বন্ধুও বলা হয়। পরিবেশের জন্য মৌমাছি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
অথচ উপকারী পতঙ্গ এই মৌমাছি আজ বিলুপ্তির পথে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ূদূষণ, অধিক তাপমাত্রা, চাক বাঁধার প্রতিকূল পরিবেশ, বৃক্ষনিধন, অধিক পরিমাণে কীটনাশকের যত্রতত্র ব্যবহার প্রভৃতি কারণে মৌমাছি হুমকিতে পড়ছে। ইটভাটায় ছোট-বড় গাছের জোগান দেওয়ার জন্য আশপাশের সমস্ত গাছ কেটে ফেলার কারণে মৌমাছির প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হয়ে যায়। বাসস্থানের অভাবে অনেক প্রজাতি আজ বিলীন। অন্যদিকে অদক্ষ মৌয়ালরা অপরিকল্পিতভাবে মধু সংগ্রহ করে থাকেন। ধোঁয়া এবং আগুনের আঁচ দিয়ে তাড়াতে গিয়ে অনেক সময় মৌমাছি মেরে ফেলা হয়। এছাড়াও জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছির আচার-ব্যবহার, শিক্ষা, দিকনির্ণয়ের ক্ষমতা, মধু সংগ্রহ এবং তাদের শারীরিক বৃদ্ধিতে প্রভাবিত হয়। কীটনাশক ও আগাছা নিধনকারী ওষুধ নিওনিক্স মৌমাছিদের মেরে ফেলে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিওনিক্সসমৃদ্ধ কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। মৌমাছির আরেক শত্রু অতি ক্ষুদ্র পোকা ভারোয়া নামক এক পরজীবী। এই একটি পোকা মৌমাছির পুরো কলোনিকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। যুক্তরাজ্যে-মোর দ্যান হানি নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়েছিল, যার মূল বিষয় ছিল মৌমাছির মৃত্যু। এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে বোঝা যায় যে বিশ্বজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি মরছে। সব মহাদেশেই আজ মৌমাছি বিপন্ন। ৮০ শতাংশ উদ্ভিদের পরাগায়নে মৌমাছি সহায়তা করে। কৃত্রিম যন্ত্রের মাধ্যমে এই কাজ করতে বার্ষিক প্রায় ২৬ হাজার কোটি ইউরো ব্যয় করতে হতো, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
মৌমাছি বিলুপ্ত হতে থাকায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে ফল ও ফসল উৎপাদনে। বিভিন্ন মধুফুল মৌসুমে মৌমাছি দ্বারা পরাগায়িত ফসলের উৎপাদন ১০-১৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়। মৌমাছি বিলুপ্ত হয়ে গেলে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে খাদ্য সংকট। ফল ফসলের ওপর প্রাণিজগতের সকল প্রাণী নির্ভরশীল। মৌমাছি বিলুপ্ত হলে খাদ্যশৃঙ্খল অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়বে। পরাগায়নের মাধ্যমে নিষেকক্রিয়ায় বীজ উৎপন্ন হয়। এই বীজ উৎপন্ন না হলে সরাসরি প্রভাব পড়বে তৃণভোজী প্রাণীর ওপর। তাদের সংখ্যা কমতে থাকবে এবং একে একে খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি স্তর ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। অনেক উপকারী গাছও এর সঙ্গে বিলীন হয়ে যাবে। এর ফলে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
গাছ লাগানো এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। তবেই আমরা আমাদের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের রক্ষা করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারব।
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
shahrin5792@gmail.com

মন্তব্য করুন