আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অন্যতম উল্লেখযোগ্য 'ব্রেক থ্রু' এসেছিল ১৭৯৬ সালে গুটিবসন্তের টিকা আবিস্কারের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার আবিস্কার করেছিলেন গুটিবসন্তের টিকা। খুবই সংগত কারণে ইংরেজ জীবাণু গবেষক এডওয়ার্ড অ্যান্টনি জেনারকে বলা হয় প্রতিষেধক বিদ্যার জনক। তখন গুটিবসন্ত ছিল এক মারাত্মক আতঙ্কের বিষয়। এক সময় মহামারি বসন্তে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। জেনারের টিকা সেই মহামারি নির্মূল করল। এই আস্কিার নানা জীবাণুঘটিত রোগের বিরুদ্ধে মানুষের সুস্থ থাকার লড়াইকে এক অন্য মাত্রা দিল। আবিস্কৃত হলো আরও বহু রোগের প্রতিষেধক। সেই পথেই ১৯৭৭ সালে পৃথিবী থেকে নির্মূল হয়ে গেছে কালান্তক গুটিবসন্ত। পৃথিবীতে শেষবার স্মল পক্স বা গুটিবসন্তের বড়মাপের মহামারি হয়েছিল ১৯৭৪ সালে, ভারতে।
কভিড-১৯ ভাইরাস সারা পৃথিবীকে পর্যুদস্ত করে ফেলেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে আর ২৮ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। একের পর এক ভ্যাকসিন আবিস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যা এর আগে এত কম সময়ে এত ভ্যাকসিন উপলব্ধ হয়নি। এবার ৭৭টি ভ্যাকসিনের ১৯৪টি ট্রায়াল হয়েছে। বাংলাদেশে সর্বমোট টিকা নিয়েছেন ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭৫ জন। টিকা নিতে নিবন্ধন করেছেন ৬৯ লাখ ৬০ হাজার ৬২৫ জন।
গত ২৩ মার্চ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় টিকা নেওয়ার পর করোনা আক্রান্তদের বিষয়ে একটি লেখা ছাপা হয়েছে। লেখাটিতে ডালাসের একটি হাসপাতালের কর্মীদের ওপর পরিচালিত জরিপের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, সেখানে পূর্ণ টিকা (দুই ডোজ) গ্রহণের পর আট হাজার ১২১ জনের মধ্যে চারজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় টিকা গ্রহণের দুই সপ্তাহ বা তারও পর ১৪ হাজার ৯৯০ জন কর্মীর মধ্যে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, সাতজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এসব জরিপে দেখা যাচ্ছে, টিকা নেওয়ার পর করোনা আক্রান্তের সংখ্যা খুবই নগণ্য। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে পেরেছে ইসরায়েল (প্রথম ডোজ ৫৯ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ ৫৫ শতাংশ), যুক্তরাজ্য (৪৭ শতাংশ, প্রথম ডোজ, দ্বিতীয় ডোজ ৮ দশমিক ২ শতাংশ), যুক্তরাষ্ট্র (প্রথম ডোজ ৩২ শতাংশ, দ্বিতীয় ডোজ ১৯ শতাংশ), ভুটান (প্রথম ডোজ ৬২ শতাংশ, দ্বিতীয় ডোজ শুরু হয়নি), ভারত (প্রথম ডোজ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, দ্বিতীয় ডোজ শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ), বাংলাদেশ (প্রথম ডোজ ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ডোজ গতকাল থেকে শুরু হয়েছে)।
বিশ্বে এখন পর্যন্ত যত করোনা টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার অধিকাংশই দুই ডোজের। একমাত্র জনসন অ্যান্ড জনসনের কভিড-১৯ টিকা একক ডোজের, যেটা পাওয়া যাচ্ছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে। যতটুকু জানা গেছে, ফাইজারের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার ১৪ দিন পর এটি শতকরা ৫২ শতাংশ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে। মডার্নার ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ দেওয়ার ১৪ দিন পর এটি ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে। আর অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রথম ডোজ দেওয়ার পর ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
কাজেই দেখা যায়, করোনা টিকার দুই ডোজের মধ্যবর্তী সময় আপনি পুরোপুরি সুরক্ষিত নন। এমনকি করোনা টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার অন্তত ১৪ দিনের মধ্যে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি দেহে তৈরি হয় না। এ সময়ের পর অ্যান্টিবডি তৈরি শুরু হয়; ধাপে ধাপে বাড়ে আর দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পর পাওয়া যায় টিকার পূর্ণ কার্যকারিতা। কাজেই করোনা টিকার দুই ডোজের মধ্যবর্তী সময়ে যে কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু যারা এক ডোজের টিকা নিয়েছেন এবং তিন-চার সপ্তাহ পর আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের ফুসফুস অপেক্ষাকৃত কম আক্রান্ত হচ্ছে। তারা দ্রুত সুস্থ হচ্ছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইসিইউ সাপোর্ট লাগছে না। তাই দ্রুত টিকাদান কর্মসূচির গতি আনতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগ, রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনগুলোর বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে।
আমরা জানি, নানাবিধ ভ্যাকসিনের কল্যাণে সারাবিশ্বে মানুষের অকালমৃত্যুর হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভবপর হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও দায়িত্ব কোনোটাই এখনও শেষ হয়নি। কেননা, এখন অবধি এইডস ও ম্যালেরিয়ার মতো কয়েকটি অতি ভয়ংকর বা স্বল্প ভয়ংকর রোগের ভ্যাকসিন আবিস্কার করা সম্ভব হয়নি। যদি ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা এসব রোগের বিরুদ্ধে সার্থক ভ্যাকসিন আবিস্কার করতে সক্ষম হন, তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞান তথা মানব সভ্যতার ইতিহাসে আরও এক নতুন অধ্যায়ের সংযোজন ঘটবে। আর এবারের দ্বিতীয় ধাপে কভিড-১৯ নতুন ধরনের ভেরিয়েন্টের ক্ষেত্রে কম বয়সী মানুষও আক্রান্ত হচ্ছে; সে ব্যাপারে নজর বাড়াতে হবে। জিনোম সিকোয়েন্সিং ও সেরো প্রিভালেন্স স্টাডি প্রতিনিয়ত করতে হবে, যাতে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়। গবেষকদের কাজে লাগানো এবং তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকাও বেশ জরুরি।
রাজনীতিক; সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফার্মাসি কাউন্সিল

মন্তব্য করুন