সম্প্রতি বাংলাদেশে মাদ্রাসার ছাত্ররা (ছাত্রীরাও কি?) রাজপথে নেমে আপন বিক্ষোভের সহিংস প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাদের এই বিক্ষোভের আশু উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। লক্ষণীয় যে একই সময়ে বামপন্থি কোনো কোনো ছাত্র সংগঠনও নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তবে তাদের বিক্ষোভটি এতো ব্যাপকও ছিল না, এতো সহিংসও ছিল না। 
অন্যদিকে আমরা দেখতে পেলাম শাসক দল এবং তার অঙ্গসংগঠন এই বিক্ষোভকে ভালো চোখে দেখেনি। তারা ভেবেছে, 'ভারতীয় অতিথিকে' অপমান করা বা 'মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান' বিঘ্নিত করা রাষ্ট্রের ভেতরে বামপন্থি অথবা হেফাজতিদের এক ধরনের ষড়যন্ত্র। তারা এর পেছনে রাজনীতি রয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ইন্ধনও রয়েছে বলে ভেবেছে। তারা চেয়েছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে 'বিক্ষোভ' হয় দমন করতে অথবা তারা যাতে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে কোনো বিঘ্ন ঘটাতে না পারে অন্তত তার ব্যবস্থা করতে। 
পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য বিভিন্নভাবে সামনে এগিয়ে এসেছিল শাসক দলের নিজস্ব অঙ্গসংগঠনগুলো। পরে অবশ্য এটা নিয়ে নিজেদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। আমরা এই সময় শাসক দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর অতি বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তারা বাম ছাত্র সংগঠনের ২৬ মার্চের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ মিছিলে হামলা চালায় এবং তাদের হামলা করে তাড়াতে তাড়াতে শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। আমি নিজেই তার সাক্ষী। যদিও বামপন্থিদের ওই মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে ভিসি চত্বরের কাছে এসে শহীদদের স্মরণে ২৬ মার্চের মোমবাতি প্রজ্বালন অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই আসছিল বলে আমি শুনেছি। উপাচার্যের বাসার কাছে এসে শহীদদের স্মরণে যে 'স্মৃতি চিরন্তন' বেদিটি আছে সেখানে মোমবাতি জ্বালানোর পর তাদের অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণভাবে ওখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে এসে ওই মিছিলটির ওপর শাসক ছাত্রসংগঠনের সহিংস আক্রমণের কোনো প্রয়োজন ছিল না বলেই আমার মনে হয়েছে।
এটা ঠিক তাদের মিছিলে 'ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী' নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু সেগুলো সাম্প্রদায়িক স্লোগান ছিল না। তারা মোদিকে আক্রমণ করছিল আদর্শগত অবস্থান থেকে, হেফাজতিদের মতো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে নয়। তাছাড়া তাদের কাছে লাঠি বা অগ্নিসংযোগের কোনো অস্ত্রও ছিল বলে মনে হয় না। আসলে তাদের মিছিলটি নাশকতামূলক ছিল না। মোদির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ এ জন্য ছিল না যে তিনি 'হিন্দু' বা তিনি 'ভারতের' প্রধানমন্ত্রী। বরং এ জন্য যে তিনি 'হিন্দুত্ববাদের' প্রবক্তা গুজরাটে দাঙ্গার সমর্থক, ভারতের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে কৃষক-শ্রমিক জনগণের সঙ্গে তার সরকার ও দলের নানা ইস্যুতে সংগ্রাম চলছে যেখানে তার ভূমিকাগুলো শুধু বামপন্থিরা নয়, মধ্যপন্থি কংগ্রেস, মানবতাবাদী যেমন- অমর্ত্য সেন এবং পৃথিবীর অন্য অনেক উদার মানুষই অনুমোদন করেন না। সেই আন্তর্জাতিক আদর্শগত সংহতির নিদর্শন হিসেবেই বামপন্থিরা সেদিন সেই মিছিলটি করেছিলেন বলে আমার ধারণা। এ ধরনের শান্তিপূর্ণ সংহতি ও বিক্ষোভ প্রকাশের রীতি অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সফরের সময়ে বামপন্থিরা অনুসরণ করেছেন। এতে আওয়ামী লীগ বা ওই জাতীয় দলের 'অ্যালার্জি' থাকাটা কাম্য নয়। তাদের নিজেদেরই নিকট-অতীতে ঘোষিত বিভিন্ন বক্তব্যের (ট্রাম্পবিরোধী বক্তব্য ও অতীতে মমতার পক্ষে বক্তব্য দ্র.) সঙ্গে বামপন্থিদের ওপর এ ধরনের উত্তেজিত আক্রমণাত্মক আচরণের কোনো সংগতি নেই। বামপন্থিদের সংহতি মিছিল বা মতাদর্শগত প্রতিবাদের বিষয়টিকে 'হেফাজতের' উগ্র আক্রমণাত্মক জ্বালাওপোড়াও অভিযানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাটা একান্তই ভুল হবে। আবার রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক 'লুটতরাজ' ও 'অগ্নিসংযোগ' রোধের জন্য রাবার বুলেট নিক্ষেপ বা নিজেরা 'আক্রান্ত' হয়ে 'প্রতি আক্রমণকে' অপ্রয়োজনীয়-অনাবশ্যক নিপীড়নমূলক হত্যায় পরিণত করাটাও কাম্য নয়। মশা মারতে কামান দাগার প্রয়োজন নেই! আবার মশা কামড়াতে থাকুক, বাড়তে থাকুক, এরকম উদাসীন থাকাও সম্ভব নয়। কোনো অবস্থাতেই দলীয় কোনো মাস্তান বাহিনীর আইন হাতে তুলে নেওয়াটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমর্থনযোগ্য নয়। 
অবশ্য এই লেখায় এসব চুলচেরা বিচার করতে আমি বসিনি। তবে সমসাময়িককালে মোদির আগমন উপলক্ষে কিছু ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনার খবরও আমরা আগেই পেয়েছিলাম- যার বিশ্নেষণ প্রয়োজন। যেমন- সুনামগঞ্জের শাল্লায় ঝুমন দাশ নামে এক ব্যক্তির ফেসবুকে হেফাজত নেতা 'মামুনুল হকের' বিরুদ্ধে একটি পোস্ট কেন্দ্র করে পুরো একটি হিন্দুপ্রধান গ্রামকে এই সময় হেফাজতের কর্মীরা এসে জ্বালিয়ে দিল। সেটা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল? এ ঘটনার আগে আওয়ামী যুবলীগের স্থানীয় একজন নেতার প্রশ্রয়ে হেফাজত কর্মীরা ওই এলাকায় সুমনের পোস্টটির বিরুদ্ধে সভা করেছিল, উত্তেজনা ফেনিয়ে তুলেছিল, প্রস্তুতি নিয়েছিল আক্রমণের। উত্তেজনা ঘনীভূত হলো এবং অবশেষে হেফাজতের নেতৃত্বে দাঙ্গাবাজরা দলবদ্ধভাবে সুমনকে শুধু নয়, সমগ্র গ্রামের সমগ্র হিন্দু জনগোষ্ঠীকে সশস্ত্র আক্রমণ করল, অথচ পুলিশ কিছুই করল না, না কোনো 'প্রিভেনটিভ মেজার' আমরা পুলিশকে নিতে দেখেছি, না কোনো ঘটনা শুরু হওয়ার পর হস্তক্ষেপ করতে আমরা দেখলাম। এগুলো সবই কি প্রশাসনের অদক্ষতা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা? আমি যেটা বলতে চাচ্ছি যে এই 'ঘটনাটি' কেন মোদি আসার আগে আগে ঘটল, কারা এর সঙ্গে নেপথ্যে জড়িত ছিল, কারা এতে অংশগ্রহণ করেছিল, কেন পুলিশ চুপচাপ ছিল- এসব নিয়ে সরকারকে অবিলম্বে তদন্ত করে একটি রিপোর্ট জাতির সামনে পেশ করতে হবে। নাহলে হয়তো ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার মূল কারণটি বের করা যাবে না।

মাদ্রাসাছাত্রদের উত্তেজিত করে সহিংস ও সন্ত্রাসবাদের দিকে তাদের ঠেলে দেওয়ার বিষয়টি বহু দিনের একটি প্রবণতা। কওমি মাদ্রাসার পরিচালকদের রাজনৈতিক একটি অংশ এই প্রবণতার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। মৌলবাদী রাজনীতির পাশাপাশি, এই প্রবণতাটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার করে আসছে এবং রাষ্ট্র চোখ বন্ধ রেখে একে 'অরাজনৈতিক' ধর্মীয় প্রবণতা হিসেবে আখ্যা দিয়ে নানাভাবে প্রশ্রয়ও দিয়ে আসছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনী রাজনীতিতে এদের ভোট ব্যাংক হিসেবে কাজে লাগানোরও চেষ্টা করেছে।
এখন এতদিন পর এই বিষবৃক্ষ সমগ্র সমাজকে গ্রাস করতে বসেছে। তাই একে গোড়া থেকে উন্মুলিত করতে হবে। আমার মনে পড়ছে তারেক মাসুদের 'মাটির ময়না' আর 'রানওয়ে' এই দুটি ছবির কথা। এই ছবি দুটি আমাদেরকে আরেকবার মনে করিয়ে দেয় গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা কীভাবে শিশু বয়স থেকে ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গিতে রূপান্তরিত হয়। কওমি মাদ্রাসায় নানাভাবে এ ধরনের প্রচ্ছন্ন জিহাদি প্রশিক্ষণ অপ্রতিহত গতিতে এতকাল বেড়ে এসেছে। ধর্মপরায়ণ মুসলমানের জাকাত, রাষ্ট্রের সশ্রদ্ধ প্রশ্রয়, শিক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশেষ ধরনের শিক্ষাকে আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার সমান মর্যাদা দান, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থ, ইসলামিক এনজিওর পৃষ্ঠপোষকতা এগুলো এই বিষবৃক্ষকে শত শাখা-প্রশাখা, পত্রপল্লব, পুষ্প-বীজসহ উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত করেছে। এই প্রক্রিয়ায় অবিলম্বে ছেদ আনতে না পারলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে বলে আমার ধারণা। 
এতকাল পরে জাতীয় সংসদে কোনো কোনো এমপি এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন- শুধু বামপন্থি এমপিরা নন, শাসক দলের সাংসদরাও বটে। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ মনে করেন, মাদ্রাসা যেহেতু দরিদ্র ছাত্রদের আশ্রয়স্থল, সুতরাং মাদ্রাসার সিলেবাস বদলেও এই একই কাজ সম্পন্ন করা যায়। কেউ কেউ মনে করেন দরিদ্র জনগণের ইহলৌকিক রাজনৈতিক সংগ্রামে মাদ্রাসার ছাত্রদের টেনে আনতে পারলে ধর্ম নির্বিশেষে শ্রেণি ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। এ ধরনের বামপন্থিরা কেউ কেউ ইদানীং লাতিন আমেরিকার খ্রিষ্টধর্মকে উদাহরণ হিসেবে, আদর্শ হিসেবে দেখিয়ে 'লিবারেশন থিওলজি' তত্ত্বও প্রচার করে থাকেন। পোপ এবং ক্যাস্ট্রোর বিখ্যাত সংলাপটিও তুলে ধরেন তারা।
আমার মতে 'মাদ্রাসার আধুনিকীকরণ' তত্ত্বও আমাদের দেশে যথেষ্ট হবে না। বিশেষত কওমি মাদ্রাসার নেতারা যদি বলেন, 'আমরা রাষ্ট্রের টাকাও চাই না, নিয়ন্ত্রণও চাই না'। তখন কী হবে? লিবারেশন থিওলজিও শেষ পর্যন্ত মৌলবাদীদের হাতের অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্ব খণ্ডন করে এবং জন্মের অঙ্গীকারই ছিল 'ধর্মনিরপেক্ষ ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয়'। এ জন্য বাংলাদেশের জন্য আদর্শ স্লোগানটি হবে 'ধর্ম যার যার (ব্যক্তিগত বিষয়) এবং রাষ্ট্র সবার'। ধর্মকে রাজনীতিতে বা শিক্ষায় বা যে কোনো ইহলৌকিক অনুষ্ঠানে বা প্রক্রিয়ায় টেনে এনে স্বতন্ত্র কোনো ধর্মভিত্তিক বাম-ডান ধারা তৈরি করার দরকার নেই। ধর্মকে ধর্মের জায়গাতে ব্যক্তিগত হৃদয়ের মণিকোঠায় রাখাটাই ব্যক্তির জন্য ধর্মকে সম্মান প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ উপায়। পক্ষান্তরে ইহজাগতিক বিষয়গুলো নিয়ে বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তচিন্তার দেশ হিসেবেই বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আশ্রয়স্থল ও শান্তির একটি উৎস হিসেবে ধর্ম আছে বা থাকবে। মানুষের মধ্যে এই আধ্যাত্মিকতা যার যার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভব ও অভ্যাসের ব্যাপার তাকে আক্রমণের দরকার নেই। তাকে আমরা যথাযোগ্য মর্যাদাও দেব। তাকে কোনোক্রমেই রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের হাতিয়ারে পরিণত করার কোনো উদ্যোগকে আমরা প্রশ্রয় দেব না। অন্তত আমাদের নিজস্ব ইতিহাসে এর কুফল সম্পর্কে যে অসংখ্য অতীত শিক্ষা আছে তা ভুলে যাওয়া আমাদের উচিত হবে না।
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন