দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখনও স্বাস্থ্যবিধি মান্য করার ক্ষেত্রে অনেকেরই যে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সংক্রমণের এক বছর পর বুধবার রেকর্ড সাত হাজার ৬২৬ জন নতুন শনাক্ত হয়েছেন, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। মৃত্যুহারও ঊর্ধ্বমুখী। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, আগের দিনের সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের সংখ্যাচিত্র পরদিনই উদ্বেগজনক হারে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) বলেছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৬টিই এখন সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে। এক মাসে ৭৪৪ শতাংশ নতুন রোগী ও ২৮০ শতাংশ মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে স্পষ্টত প্রতীয়মান, এ দফায় সংক্রমণের ঢেউ উঠছে খাড়াভাবে। জনস্বাস্থ্যবিদদের ভাষ্য, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতদিন অব্যাহত থাকবে, বলা মুশকিল। এ পরিস্থিতিতে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে ব্যত্যয় ঘটলে পরিণতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আমরা জানি, যে কোনো রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরি সচেতনতা ও সতর্কতা। এক বছরেরও বেশি সময়ে মানুষ এই সংক্রমণ প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে অনেকটা জ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও নিয়ম মানার ক্ষেত্রে অনীহার ফলেই যে সংক্রমণের চিত্র স্ম্ফীত হয়ে উঠছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন সংক্রমণ ঠেকাতে করণীয় কোনো ব্যবস্থারই যে যথাযথ কার্যকারিতা নেই- এও স্পষ্ট। বৃহস্পতিবার সমকালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, 'অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই' শুরু হয়েছে টিকার দ্বিতীয় ডোজ। প্রায় ৫৬ লাখ মানুষ প্রথম ডোজ নিয়েছেন। দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে সমসংখ্যককেই। বর্তমানে সরকারের হাতে টিকা মজুদ আছে প্রয়োজনের নিরিখে সাড়ে ৯ লাখ ডোজ কম। এখন পর্যন্ত আমাদের টিকাপ্রাপ্তির মূল উৎস ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট মাসে যে সংখ্যক টিকা উৎপাদন করতে সক্ষম, তার চেয়ে কয়েক গুণ চাহিদা তাদের কাছে জমা পড়েছে। ভারত নিজেদের চাহিদার বাইরেও অন্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে টিকা সরবরাহে অঙ্গীকারবদ্ধ। অন্যদিকে কোভ্যাক্সের যে এক কোটিরও বেশি ডোজ টিকা দেওয়ার কথা ছিল তাও বিলম্বিত প্রক্রিয়ায় পড়ে গেছে। এ অবস্থায় দ্রুত বিকল্প উৎসের দিকে আমাদের যেতেই হবে। একই সঙ্গে দেশে টিকা উৎপাদনের যে কথা হচ্ছে, এই প্রক্রিয়াও গতিশীল করা জরুরি। এ জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমতিপ্রাপ্তিসহ কাঁচামাল আমদানি, যথাযথ সংরক্ষণাগার, প্রযুক্তি সহায়তার ব্যাপারে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে।

দেশের সরকারি ওষুধ কোম্পানিসহ কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানির যেহেতু টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, সেহেতু সময়ক্ষেপণ না করে এ ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে করণীয় সবকিছু করা উচিত দ্রুততার সঙ্গে। আমরা জানি, বিশ্বে এর আগে কোনো টিকাই এত দ্রুততম সময়ে আবিস্কৃত হয়নি এবং তা সম্ভব হয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতার কারণে। সংবাদমাধ্যমে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সংকটের চিত্রও উঠে আসছে। আমরা মনে করি, দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে করোনা চিকিৎসায় যুক্ত করে পরিসর বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে 'হাই ফ্লো' অক্সিজেন সরবরাহ, আইসিইউ বৃদ্ধির দিকেও জোর দিতে হবে। করোনা চিকিৎসায় দ্রুত 'ফিল্ড হাসপাতাল' গড়ে তোলাও জরুরি। ফিল্ড হাসপাতালে রোগীর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যেমন সহজ হবে, তেমনি সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রেও তা অনেকটাই হবে সহায়ক। এসব হাসপাতালে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দুর্যোগ মোকাবিলা অনেকটাই সহজ হবে। তা ছাড়া নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারও আমলে রাখতে হবে।

গতবার এ ক্ষেত্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তরের মধ্যে আরও সমন্বয় অপরিহার্য। স্বাস্থ্য বিভাগের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা নিয়ে ইতোপূর্বে বিস্তর কথা হলেও তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলেই প্রতীয়মান। জনস্বাস্থ্যবিদ, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও তারা কতটা আমলে নিচ্ছে- প্রশ্ন আছে এ নিয়েও। সংক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে ত্রিমাত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই। একদিকে জনসাধারণকে যেমন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, অন্যদিকে দ্রুততর চিকিৎসার প্রস্তুতিতেও ছাড় দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি সর্বাত্মক টিকাকরণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে।

মন্তব্য করুন