১৯৭০-এর জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে এদেশের আপামর জনগণ আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী করেছিল। নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ও শাসনতন্ত্র যাতে রচিত হতে না পারে সে লক্ষ্যে শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বহুমুখী ষড়যন্ত্র ও তৎপরতা। ৩ মার্চ ১৯৭১ আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক স্থগিত ঘোষণার মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রের নগ্ন রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পাকিস্তানি জান্তার এরূপ পদক্ষেপে বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে; শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু লাখ লাখ মানুষের সামনে ঘোষণা করলেন বাঙালির 'মুক্তি' ও 'স্বাধীনতা' সংগ্রামের। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নীলনকশা অনুযায়ী ঢাকাসহ সারাদেশে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালি হত্যাযজ্ঞে নেমে পড়ে। নিরস্ত্র বাঙালি প্রতিরোধে এগিয়ে আসে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে। ২৬ মার্চ '৭১-এর প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মাধ্যমে।

বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল রচনা করেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ঘোষণাপত্রের প্রথম অংশে ঘোষণার প্রেক্ষাপট হিসেবে, একটি শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায় '৭০-এর নির্বাচন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, ৩ মার্চ আহূত জাতীয় সংসদের অধিবেশন বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা, পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী তাদের প্রতিশ্রুতি পালনের পরিবর্তে বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলাকালে একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা, উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান, পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনাকালে দেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও নজিরবিহীন নির্যাতনের বিষয়গুলো বর্ণনা করা হয়।

ঘোষণাপত্রে উপরোক্ত প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষে যে রায় দিয়েছেন, তা উল্লেখ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, 'আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী জনগণ কর্তৃক আমাদিগকে প্রদত্ত কর্তৃত্বের মর্যাদা রক্ষার্থে নিজেদের সমন্বয়ে যথাযথভাবে একটি গণপরিষদরূপে গঠন করলাম এবং পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করলাম এবং এতদ্দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ইতোপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করছি এবং এতদ্দ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন।' ঘোষণাপত্রে আরও উল্লেখ করা হয় যে, রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক এবং ক্ষমা প্রদর্শনসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী হবেন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রয়োজনবোধে মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন। রাষ্ট্রপ্রধানকে কর ধার্য, অর্থব্যয়, গণপরিষদের অধিবেশন আহ্বান ও মুলতবির ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য সকল ক্ষমতাও অর্পণ করা হয়। ঘোষণাপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, 'রাষ্ট্রপ্রধান যদি কোনো কারণে না থাকেন অথবা কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রদত্ত সকল ক্ষমতা ও দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন।' জনপ্রতিনিধিরা ঘোষণাপত্রে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন যে, 'বিশ্বের একটি জাতি হিসেবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের ওপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছে তা আমরা যথাযথভাবে পালন করব এবং আমাদের স্বাধীনতার এ ঘোষণা ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকরী বলে গণ্য হবে।'


অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ওই দিনেই 'লজ অব কন্‌টিনুয়্যান্স এনফোর্সমেন্ট অর্ডার ১৯৭১' অর্থাৎ আইনের ধারাবাহিকতা বা বলবৎকরণ আদেশ জারি করেন। ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়, ঘোষণাপত্র সাপেক্ষে ২৫ মার্চ ১৯৭১ তারিখে বাংলাদেশে বিদ্যমান সকল আইন কার্যকর থাকবে; সিভিল, মিলিটারি, বিচার বিভাগ ও কূটনৈতিক বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন, করবেন তারা নিজ নিজ পদ থেকে একই শর্তে দায়িত্ব পালন করবেন। ওই আদেশের কার্যকারিতা দেওয়া হয় ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে। ১৭ এপ্রিল '৭১ মুজিবনগরে (মেহেরপুরে) বাংলাদেশের প্রথম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এসেছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক জারি করা হয় 'দ্য প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার, ১৯৭২'। ফলে, নতুন সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। ওই আদেশের বিধান অনুযায়ী ১২ জানুয়ারি '৭২ রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু, প্রধান বিচারপতি হিসেবে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে শপথবাক্য পাঠ করান। একই দিন প্রধান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান এবং নতুন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল দিনটিও জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওই দিন গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত পরিষদনেতা বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে পরিষদের প্রবীণতম সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ বৈঠকে সভাপতিত্ব ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি প্রথমে নিজেই নিজের শপথবাক্য পাঠ করেন এবং পরে পরিষদের অন্য সদস্যদের শপথ পাঠ করান। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের সমর্থনে শাহ্‌ আব্দুল হামিদ স্পিকার এবং তাজউদ্দীন আহমদের প্রস্তাবে এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সমর্থনে মাহমুদউল্লাহ ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন সর্বসম্মতভাবে। পরিষদ নেতা বঙ্গবন্ধু নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে বাংলার যে লাখ লাখ মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের মহান আত্মার প্রতি পরিষদের শ্রদ্ধা এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে একটি শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। শোক প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম গণপরিষদে 'স্বাধীনতা' সম্পর্কীয় একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের ওপর সদস্যদের আলোচনার শেষ প্রস্তাবটি গৃহীত হয় নিল্ফেম্নাক্তভাবে- "বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের যে বিপ্লবী জনতা, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবী, বীরাঙ্গনা, প্রতিরক্ষা বিভাগের বাঙালি, সাবেক ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের রক্ত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন- আজকের দিনে বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশ গণপরিষদ সশ্রদ্ধচিত্তে তাদের স্মরণ করছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন এবং যে ঘোষণা মুজিবনগর থেকে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বীকৃতি ও সমর্থিত হয়েছিল এই সঙ্গে গণপরিষদ তাতে একাত্মতা প্রকাশ করছে। স্বাধীনতা সনদের মাধ্যমে যে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল আজ সে সনদের সঙ্গেও এ পরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করছে। এক্ষণে এই পরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সেই সব মূর্ত আদর্শ যথা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্য একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করছে।" উপরোক্ত প্রস্তাবটি থেকে এটা স্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ ১৯৭১ স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন, যা ১০ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বীকৃত ও সমর্থিত হয়েছিল, ১০ এপ্রিল ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সনদ বা ঘোষণাপত্র এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার সঙ্গে গণপরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করে।

৪ নভেম্বর ১৯৭২ গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০-এ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ভাষণ, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক ভাষণ ও দলিল উল্লেখে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ সংবিধান প্রবর্তন হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়কালের জন্য ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং ওই ভাষণ ও দলিলগুলো সংবিধানে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল হিসেবে সংযোজিত হয়েছে।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একাত্তর এবং বাহাত্তর উভয় সালের ১০ এপ্রিল দিনটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। সে কারণে দিনটি সম্পর্কে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে প্রয়োজন সকল মহলের উদ্যোগ।

বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন