গত ১৫ মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষালয়ে ৬২ শিশু বলাৎকার বা ধর্ষণের মতো যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসবের জের ধরে করুণ মৃত্যুও ঘটেছে তিনজনের- শনিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য যেমন বেদনাদায়ক, তেমনই বিক্ষোভ-জাগানিয়া। কিন্তু এই চিত্র দেখে বিস্মিত হওয়ার সুযোগ সামান্যই। সংবাদমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখে থাকি, ধর্মীয় শিক্ষকের ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থী। এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না- এসব খবর নিমজ্জিত হিমশৈলীর দৃশ্যমান চূড়ামাত্র। প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। এসব ধর্মীয় শিক্ষালয়ে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের যেসব অঘটন ঘটে থাকে; স্বাভাবিকভাবে তার সামান্যই 'দুর্ঘটনাক্রমে' সংবাদমাধ্যমে আসে। সমকালে আলোচ্য প্রতিবেদনটি প্রকাশের এক দিন আগে সমকালেই আমাদের পড়তে হয়েছে আরেকটি খবর- কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে এক শিশু মাদ্রাসা থেকে দৌড়ে থানায় গেছে বিচার চাইতে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাকে প্রায়ই যৌন নির্যাতন করত তারই এক শিক্ষক। এ চিত্র যেন অনুভূতি ভোঁতা করে দেয়। অভিভাবকরা তার সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার দায়িত্ব যেসব ব্যক্তির হাতে তুলে দেন, তাদের মুখোশের অন্তরালে এমন অমানুষ বসবাস করে! অস্বীকার করা যাবে না- শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন মাদ্রাসার বাইরে অন্যান্য আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কমবেশি ঘটে থাকে। এমনকি ঘরের কোণে অনেক আত্মীয়স্বজনের মুখোশও খুলে পড়ে সুযোগ পেলে।

কিন্তু যে ধর্ম ও নৈতিকতার বাণী শুনিয়ে আমরা অনেক সময় এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রত্যাশা করে থাকি; সেই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যখন শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে থাকে; তখন ভরসার কাচের দেয়ালটিও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন বন্ধ করা আরও দুটি কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, কথিত 'কওমি' ধারার বেশিরভাগ মাদ্রাসাই আবাসিক। ফলে সেখানে শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন অপেক্ষাকৃত সহজ। আলিয়া ধারার মাদ্রাসা বা সাধারণ বিদ্যালয়ে শিশুরা সারাদিন থাকলেও রাতে অভিভাবকের নিশ্চিত আশ্রয়ে ফিরে আসে। দ্বিতীয়ত, গত কয়েক দশকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া কওমি মাদ্রাসাগুলোর অধিকাংশ শিশু শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। নিছক সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে তারা মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করে যায়। অনেক সময় অভিভাবকরা জানতে পারলেও প্রতিকারহীন থেকে যায় এসব অপরাধ। এ প্রসঙ্গে সেসব অনাথ শিশুর কথাও ভাবতে হয়, যাদের অভিভাবক বলে সমাজে কেউ নেই। শত অত্যাচার ও নির্যাতন সয়ে এতিমখানাতেই তাদের দিন কাটে।

মাদ্রাসার চার দেয়ালের বাইরে তাদের কেউ নেই যে ছুটে গিয়ে আশ্রয় খুঁজবে। অভিভাবক থাকুক বা না থাকুক; শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন রুখে দাঁড়াতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজকেই। আমরা দেখছি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে কেবল কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রেই স্পষ্ট প্রতিবিধান রয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে যদিও ওই আইনে ছেলেশিশু ধর্ষণেরও বিচার করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। আরও স্পষ্টতার জন্য আইনটির সংশোধনী জরুরি। একই সঙ্গে 'ধর্ষণ' ও 'বলাৎকার' নিয়ে সমাজে যে ধারণাগত বিভ্রান্তি রয়েছে, তা-ও দূর করা দরকার। আমরা মনে করি, ছেলে বা মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই যে কোনো ধরনের যৌন নির্যাতন 'ধর্ষণ' হিসেবে চিহ্নিত এবং সে অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করা দরকার। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বা মেয়ের ক্ষেত্রে সম্মতি-অসম্মতির প্রশ্নটিও অবান্তর।

অভিযোগ ওঠামাত্রই সুষ্ঠু তদন্ত ও সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এ নিয়ে জনপরিসরে আলাপ-আলোচনা বাড়া দরকার। সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে এমন জঘন্য অপরাধ চেপে রাখার প্রবণতা কেবল নির্যাতনকারীদেরই সুবিধা দেবে এবং এ অপরাধের সংখ্যা ও মাত্রা বাড়াতে সহায়ক হবে। বিশেষত কওমি মাদ্রাসার বিভিন্ন বোর্ডের নীতিনির্ধারকদের নিতে হবে কঠোর অবস্থান। কতিপয় অমানুষের দায় ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কেন? আমরা জানি, নিমজ্জিত হিমশৈলী কীভাবে নৌযানের জন্য বিপর্যকর হতে পারে। মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের নিমজ্জিত হিমশৈলীর বিহিত যদি না করা যায়, তাহলে গোটা শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থার বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

মন্তব্য করুন