ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে পরপর দু'দিন ধান 'রক্ষা'র জন্য যেভাবে বাবুই পাখির বাসা ধ্বংস করে প্রায় দুইশ বাবুই ছানা মেরে ফেলা হয়েছে, তা যেমন অমানবিক, তেমনই অচিন্তনীয়। মানুষ এতটা অমানুষ হয় কীভাবে! ঘটনাগুলো ইতোমধ্যে মানুষকে স্পর্শ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়াও আমরা দেখেছি। শুক্রবার ঝালকাঠিতে আগুন দিয়ে অন্তত ৩০টি বাবুই ছানা পুড়িয়ে মারা হয়। তার রেশ না কাটতেই পিরোজপুরে দেড় শতাধিক বাবুই পাখির ছানা হত্যার ঘটনা ঘটে। আমরা মনে করি, ঘটনাগুলোতে ব্যক্তির অজ্ঞানতা যেমন দায়ী, তেমনি পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে আমাদের সামষ্টিক অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। আমরা জানি, পশু-পাখি ও প্রাণিকুল প্রতিবেশ ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৃহত্তর অর্থে মানুষের উপকারেই এদের সৃষ্টি। এমনকি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এদের বিকল্পও নেই। আমরা দেখছি, এখানে ধান খেয়ে ফেলার তুচ্ছ অভিযোগ করা হয়েছে। কার্যত পাখি যতটা ধান খায়, তার চেয়ে ক্ষেতের পোকামাকড় খেয়ে জমির ফলন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আমরা দেখেছি, বরং ক্ষতিকারক পোকা নিধন ও পরিবেশবান্ধব বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জমিতে 'পাখি বসার খুঁটি' বা 'পার্চিং'-এর বিষয়ে জোর দিচ্ছে। ফলে কৃষক ধান কিংবা সবজি ক্ষেতে সব সময় লম্বা খুঁটি পুঁতে দেয়, যাতে সবুজ ক্ষেতে লম্বা খুঁটিতে পাখি এসে বসতে পারে।

আমরা জানি, চীনে পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে যে মহাদুর্ভিক্ষে অন্তত দেড় কোটি মানুষ মারা যায়, তার মূলে ছিল চড়ূই পাখি হত্যা। বিপ্লবী নেতা মাও সে তুং যখন চীনের 'উন্নয়নের বাধা' হিসেবে চিহ্নিত করে সারাদেশ থেকে চড়ূই নিধনের নির্দেশ দেন, তখনই সেখানে ফসলের ক্ষেতে পঙ্গপালসহ ক্ষতিকর পোকামাকড়ের উৎপাত শুরু হয়। তাতে চীনের ফলন কমে শস্যভান্ডার খালি হয়ে যায়। চীন অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে চড়ূই আমদানি করে সেই বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হয়। আমরা মনে করি, কেবল ঝালকাঠি কিংবা পিরোজপুর নয়; এভাবে সারাদেশে পাখি ও প্রাণিকুল হত্যার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এখনও অতিথি পাখি হত্যা কিংবা বুনো পাখি হত্যা করে তার বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না। লোকালয়ে কোনো বন্যপ্রাণী প্রবেশ করলে দল বেঁধে হত্যায় অনেকেই মেতে ওঠে। অথচ আইন অনুযায়ী যে কোনো বন্যপ্রাণী মারা নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে প্রশাসনকেও খুব তৎপর হতে দেখা যায় না। আমরা চাই, পশু-পাখি হত্যা বন্ধে প্রশাসন দুইভাবে ভূমিকা পালন করুক।

বন্যপ্রাণী আইন সম্পর্কে জানানো যেমন জরুরি, তার চেয়ে বেশি দরকার পশু-পাখি হত্যার বিরূপ প্রভাব এবং এরা কীভাবে পরিবেশের উপকার করে, সে সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। একই সঙ্গে কোথাও বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনা ঘটলে তার শাস্তি প্রদান করাও জরুরি। আমরা জানি, বাবুইসহ অনেক পাখিই বিলুপ্তপ্রায়। আগের মতো গ্রামেও এখন এসব পাখি দেখা যায় না। বাবুই দলবদ্ধ প্রাণী বলে এদের একসঙ্গে থাকতে দেখা যায়। প্রকৃতির নিপুণ কারিগর বাবুই পাখির ঘর তৈরির প্রকৌশল অনেককেই বিস্মিত করে। যে তালগাছে বাবুই বাসা বাঁধে, সেখানে একসঙ্গে অনেক বাসা দেখা যায়। বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসাগুলোতে যেমন ছানা থাকে, তেমনি ডিমও থাকে।

নিকটবর্তী দুটি জেলায় যেভাবে বাবুই পাখির ছানা ধ্বংস করা হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে তার প্রভাবও আমরা দেখতে থাকব। বলা বাহুল্য, প্রাকৃতিক যেসব দুর্যোগ আমরা দেখছি, তার অধিকাংশই আমাদের কর্মকাণ্ডের ফল। প্রাণী হত্যা, বৃক্ষনিধন, নদী দখল-দূষণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা পরিবেশকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলছি। বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা-দুর্যোগও যে পরিবেশেরই এক ধরনের প্রতিশোধ- তা অনেকেই ইতোমধ্যে বলেছেন। আমরা চাই, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের ঘটনা আমলে নিয়ে প্রশাসন তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। তুচ্ছাতিতুচ্ছ অভিযোগে এভাবে পাখি নিধন চলতে থাকলে তা আদতে আমাদের জন্য বহুমাত্রিক ঝুঁকিই তৈরি করবে।

মন্তব্য করুন