কবি সমর সেন তার এক লেখায় 'বাধ্যতামূলক হতাশা' শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন। আমাদের সমাজে বিভিন্ন প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম আমরা দেখেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল গণযুদ্ধের মাধ্যমে যখন বেশির ভাগ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল সাম্প্রদায়িক মনোভাব। অথচ তার পরেও যখন এই সমাজে টিকে থাকে ধর্মান্ধতা, তখন সমর সেনের বলা কথাটিই মনে পড়ে। যত প্রগতিবাদী আন্দোলনই এখানে হোক না কেন, ধর্মান্ধতা টিকে থাকতে দেখার হতাশা কি আমাদের সমাজে বাধ্যতামূলক?

প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সংঘটিত পৈশাচিক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার মুহূর্তগুলো বর্ণনা করে লিখেছিলেন- 'এমনই তখন পরিস্থিতি যে, সমাজদেহে বহুকাল ধরে বপন করা রোগের নিরাকরণ যেন অসাধ্য, উপসর্গের উপশমের ব্যবস্থাও যেন ব্যর্থ।' সেই নির্মম মহাদাঙ্গার সময়ও কিন্তু অনেক হিন্দু ও মুসলমান নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিদ্বেষে উন্মত্ত মানুষদের হাত থেকে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রাণরক্ষা করেছিলেন। যদি সবাই এই শুভবোধসম্পন্ন মানুষের মতো হতো, তাহলে কি আর কলকাতা, নোয়াখালী, বিহারে সেই সময় প্রাণ হারাত অজস্র নিরীহ মানুষ?

অবশ্যই ধর্মান্ধতা কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার নয় যে, তা মানুষের মনে টিকে থাকবেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহে ইংরেজ সামরিক অফিসার টি. ই. লরেন্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের ঘটনা নিয়ে নির্মিত ডেভিড লিনের বিখ্যাত 'লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া' (১৯৬২) ছবির একটি সংলাপ মনে পড়ছে। বেদুইন নেতারা লরেন্সকে একটি বিশেষ মুহূর্তে বলেছিলেন- 'ইট ইজ রিটেন'। লরেন্স উত্তর দিয়েছিলেন- 'নাথিং ইজ রিটেন।' অত্যন্ত বিপজ্জনক বিবেচনা করে বেদুইনরা যা করতে চায়নি, লরেন্স গভীর মনোবল নিয়ে সেই কাজটি করে প্রমাণ করেছিলেন যে কোনো কিছুই নির্ধারিত নয়। এ কথাটি কেবল একটি চলচ্চিত্রের সংলাপ নয়, বাস্তব জীবনেও কোনো কোনো সমস্যা নির্মূলের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা না করেই আমরা ভাবি যে, এই সংকট সমাজ থেকে কখনোই দূর করা যাবে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সফলতা পেয়ে আমরা তুষ্ট থেকেছি, কিন্তু সাধারণ মানুষের মন ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করার জন্য কি আমরা যথেষ্ট মনোযোগী হয়েছি?

সামরিক শাসকরা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার শুরু করেছিল। কিন্তু গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মভিত্তিক দল এবং গোষ্ঠীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেছে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য। ফলে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং বাঙালি অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী সমাজে সক্রিয় থাকার সুযোগ পেয়েছে। 'পলিটিকস মেক্‌স স্ট্রেঞ্জ বেডফেলোজ'- এই নীতি আদৌ সমাজের মঙ্গল করে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। বিশেষ করে যখন প্রগতিশীলতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রক্ষার কথা বলা হয়, তখন রাজনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্তির প্রয়োজনে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেওয়া হলে তো সমাজের কল্যাণ হওয়ার কোনো কারণ নেই। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের বছরেও আমরা দেখলাম সুনামগঞ্জের শাল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং দেশের অন্যান্য স্থানে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির তাণ্ডব। ধর্মান্ধ গোষ্ঠী এই সাহস সঞ্চয় করেছে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলেই।

ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অসহিষ্ণুতা দূর করার জন্য সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। প্রগতিপন্থিরা প্রায়ই বিভিন্ন বক্তৃতায়, লেখায়, আলোচনায় উল্লেখ করেন ধর্মান্ধতা নির্মূল করতে হবে। কিন্তু কেবল এ কথা বলাই কি যথেষ্ট? নাগরিকদের বিশেষ করে কম বয়সীদের মধ্যে যুক্তিবোধ আর চিন্তাশীলতা তৈরি করবে, এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য শিক্ষক, সাহিত্যিক, শিল্পী, কবি, চলচ্চিত্রকার, সাংবাদিকরা কি নিজেরা সচেতনভাবে চেষ্টা করছেন বা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন? ধর্মীয় অন্ধচিন্তা আর উগ্রতা সমাজে বাড়তে থাকার পরিস্থিতিতেও দেশের নাটক-চলচ্চিত্রে এই গুরুতর সমস্যা নিন্দা করার চেষ্টা নেই। অথচ নাটক-চলচ্চিত্রের বার্তার মাধ্যমে অজস্র দর্শককে ধর্মান্ধতার অশুভ প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব। তারেক মাসুদের 'মাটির ময়না' (২০০২) বাংলাদেশে তৈরি হাতেগোনা কয়েকটি ছবির একটি, যা বিভিন্ন সংলাপের মাধ্যমে ধর্মীয় গোঁড়ামি আর রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের বিরুদ্ধে যৌক্তিকভাবে বক্তব্য তুলে ধরেছিল। কিন্তু দেশের মানুষ যেন এমন আরও ছবি দেখতে পায় তা নিশ্চিত করা হয়নি।

ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে এমন নাটক-চলচ্চিত্র সচেতনভাবে নির্মাণ তো করা হচ্ছেই না বরং এমন প্রসঙ্গ স্পর্শকাতর বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজে কিছু বক্তা প্রায়ই অযৌক্তিক, অসহিষ্ণু বক্তব্য দিচ্ছেন; অমুসলিম এবং নারীদের সম্পর্কে অবমাননাকর কথা বলছেন। সেইসব ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। অন্যদিকে, বেশির ভাগ টেলিভিশন নাটক আর চলচ্চিত্রে দর্শককে বুদ্ধি-উজ্জ্বল করে তোলার চেষ্টা করার পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে হালকা বিনোদন। মানুষের মধ্যে বিবেচনাশক্তি এবং শুভবুদ্ধি সৃষ্টি করবে, এমন সাংস্কৃতিক উপাদান পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা আমাদের সমাজে নেই। তাহলে কী করে আমরা আশা করতে পারি যে, অন্ধচিন্তা আর যুক্তিহীনতা দূর হবে?

শুধু ২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বর নয়, যদি প্রতি মাসেই অন্তত এক দিন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্র বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করা হতো, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের সঙ্গে বহু মানুষের মানসিক নৈকট্য গভীর হতো। সাংসদরা যদি নিজেদের এলাকায় পাঠাগার স্থাপন করে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান প্রভৃতি দিক সম্পর্কে বই পড়তে অনুপ্রাণিত করতেন, তাহলে ধীরে ধীরে সমাজে চিন্তার গভীরতা বাড়ত। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও দায়সারাভাবে পুঁথিগত বিদ্যার পরিবর্তে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন দিক, বাঙালি সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ, দেশপ্রেম, চিন্তার মুক্তির প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি দিক সম্পর্কে গুরুত্বের সঙ্গে বলা প্রয়োজন।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় উদাসীনতা, দুর্নীতি, ধর্মান্ধতার বিস্তার, সুশাসনের অভাব প্রভৃতি বৃহৎ সমস্যা নিয়ে সচেতন নাগরিকরা বিচলিত হচ্ছেন এবং প্রায়ই আলোচনা করছেন। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ বিচক্ষণতার সঙ্গে চিন্তা করতে সক্ষম না হলে গুরুতর সমস্যাগুলো কখনোই সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব হবে না- এই সত্যটিও অনুধাবন করা প্রয়োজন। সমাজের সাধারণ মানুষের মনে যদি অজ্ঞতা আর অন্ধত্ব টিকে থাকে তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে রেখে সমাজের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন দিক টিকিয়ে রাখা হবে খুব সহজ।

বিখ্যাত চিন্তাবিদ আবু নাসের আল-ফারাবি তিন ধরনের মানুষের কথা বলেছিলেন। ভালো কাজ কী তা যারা বোঝে না তারা হলো অবোধ মানুষ। যারা খারাপ কাজকেই ভালো এবং সঠিক কাজ মনে করে তারা হলো ভ্রান্তচিন্তার মানুষ। আর যারা ন্যায় আর সততা কী তা বোঝার পরেও নিজেদের সুবিধার জন্য অন্যায় করে তারা হলো বিপথগামী ও বিকৃত চিন্তার মানুষ। ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতার মতো অহিতকর দিক সেই সমাজেই টিকে থাকে যেখানে বহু মানুষের মন জ্ঞান আর শুভবুদ্ধির আলোয় উজ্জ্বল নয়। আমাদের দেশে যুগের পর যুগ ধর্মান্ধতা টিকে আছে এই অকল্যাণকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং মানুষের মনে সুবিবেচনাবোধ সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতার জন্যই।

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন